মহাকাশে রহস্যময় “ভবঘুরে” ব্ল্যাক হোল! নক্ষত্র গিলে খেতেই ধরা পড়ল নাসার ক্যামেরায়

মাদার গ্যালাক্সি বা মূল ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরে এক বিরল “ভবঘুরে” (Wandering) সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণত সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল কোনো গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে। তবে এই ক্ষেত্রে, গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে এক অনাথ নক্ষত্রকে ধ্বংস করার সময় নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোলটি।
গ্যালাক্সির কেন্দ্র ছেড়ে বাইরে ঘুরে বেড়ানো এই ধরনের গোপন ব্ল্যাক হোলগুলোকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এবং ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের গবেষক দলের এই বিরল আবিষ্কার সংক্রান্ত গবেষণাটি বিখ্যাত ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রথম শনাক্ত করে এই অস্বাভাবিক আলো
২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার পালোমার অবজারভেটরিতে অবস্থিত ‘জ্যুইকি ট্রানজিয়েন্ট ফ্যাসিলিটি’ (ZTF)-র মাধ্যমে প্রথম এই অস্বাভাবিক আলোর ঝলকানি (Flare) নজরে আসে। অ্যালগরিদম ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে এই মহাজাগতিক ঘটনাটি চিহ্নিত করা হয়।
বিজ্ঞানীরা জানান, পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি গ্যালাক্সির বাইরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল। এটি ছিল একটি ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ (Tidal Disruption Event)—অর্থাৎ, কোনো বিশাল ব্ল্যাক হোলের অভিকর্ষ বলের টানে কাছে চলে আসা কোনো নক্ষত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে গিলে নেওয়ার ঘটনা। ধ্বংসপ্রক্রিয়ার সময় নির্গত অতিবেগুনি রশ্মির (Ultraviolet Light) আলো কিছুক্ষণের জন্য তার পুরো গ্যালাক্সির আলোকেও ম্লান করে দিয়েছিল।
‘সুইফ্ট’ টেলিস্কোপ নিশ্চিত করল ব্ল্যাক হোলের পরিচয়
প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর চিলির SOAR টেলিস্কোপ এবং নাসার ‘সুইফ্ট অবজারভেটরি’ (Swift Observatory) এটি নিয়ে বিশদ গবেষণা চালায়। সুইফ্ট টেলিস্কোপের আল্ট্রাভায়োলেট/অপটিক্যাল যন্ত্রের সাহায্যে ধ্বংসাবশেষের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয় প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫৪,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। এই চরম তাপমাত্রাই নিশ্চিত করে যে এটি সত্যিই এক টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট।
ব্ল্যাক হোলটির আকার: বিজ্ঞানীদের অনুমান অনুযায়ী, এই লুকানো ব্ল্যাক হোলটির ভর আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় ১০ লাখ গুণ! অথচ এটি তার মূল গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে।
কেন এই ব্ল্যাক হোলকে ‘এতিম’ বা ‘ভবঘুরে’ বলা হচ্ছে?
মহাকাশবিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ব্ল্যাক হোলটি মূলত অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে মহাজাগতিক বিবর্তনের ফলে এটি বর্তমান স্থানে এসে পৌঁছেছে।
সম্ভাব্য কারণ ১: অতীতে হয়তো একাধিক গ্যালাক্সি একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে মিশে গিয়েছিল (Galaxy Merger)। তখন অভিকর্ষজ টানের ধাক্কায় হালকা ওজনের এই ব্ল্যাক হোলটি গ্যালাক্সির একপ্রান্তে ছিটকে পড়ে।
সম্ভাব্য কারণ ২: এটি হয়তো কোনো ছোট গ্যালাক্সির অংশ ছিল, যা এখনও বড় মূল গ্যালাক্সিটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি, নাসার নান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ এবং আপগ্রেড হওয়া সুইফ্ট অবজারেভেটরির নজরদারিতে এই ধরণের আরও একাধিক “ভবঘুরে” সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের গোপন রহস্য উন্মোচিত হবে।