“জবাবদিহি না থাকলে তদন্তের মানে কী?” নিট আন্দোলন মামলায় সুপ্রিম কোর্টের কড়া হুংকার!

ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজপথে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, যাঁরা নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছেন, আইন তাঁদের বিচার করবে। এই ঘটনার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে এবং দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা না হলে সেই তদন্তের কোনো অর্থই থাকে না। একইসঙ্গে, পুলিশি অত্যাচারের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য একটি ‘হাই পাওয়ার’ বা উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের জোরালো ইঙ্গিতও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
শুধু দিল্লিই নয়, ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষোভে পুলিশি লাঠিচার্জ ও নির্যাতনের এই ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ সহ মোট সাতটি রাজ্য (মহারাষ্ট্র, কেরালা, বিহার, অসম, উত্তর প্রদেশ ইত্যাদি) এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
পুলিশের ‘লাঠিচার্জ’ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে সিজেপি বিক্ষোভকারীদের ‘সংসদ চলো’ অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ আন্দোলনকারীদের হঠাতে নির্বিচারে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিলেন আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা। এর আগে সোমবারের শুনানিতেও সুপ্রিম কোর্ট মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে এবং আন্দোলন যতক্ষণ শান্ত থাকে, ততক্ষণ বলপ্রয়োগ করা যায় না।
মঙ্গলবারের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং অন্যান্য বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আরও একধাপ এগিয়ে জানায় যে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের জন্য একটি সর্বজনীন ও নতুন প্রোটোকল তৈরি করা জরুরি। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, “গণতন্ত্রে আন্দোলন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আন্দোলন ও পুলিশি পদক্ষেপ সংক্রান্ত একটি সর্বজনীন প্রোটোকল তৈরি হয়ে গেলে, যাঁরাই অতিরিক্ত অতিসক্রিয়তা বা অন্যায় করেছেন, তাঁদের সকলকেই খুব সহজে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারের পক্ষ থেকে সওয়াল
কেন্দ্র এবং দিল্লি সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে জানান যে, ছাত্রদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়ে থাকলে সরকার তা কখনই হালকাভাবে দেখছে না। তাঁর বক্তব্য, “যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে এই সংঘর্ষে ২৫০ জন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন। সত্য সামনে আনতে যেমন নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার, তেমনই পুলিশ বাহিনীর মনোবলও যাতে ভেঙে না যায়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।” তুষার মেহতার আরও দাবি, এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা সরাসরি হিংসায় যুক্ত ছিলেন না, বরং ভিড়ের মধ্যে কিছু সমাজবিরোধী ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ঢুকে পড়েছিল।
প্রধান বিচারপতিও এই বিষয়ে মত প্রকাশ করে বলেন, শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দুষ্কৃতীদের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মহিলা, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের অভিযোগের পেছনেও বাস্তব সত্যতা রয়েছে বলে স্বীকার করে আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশাবলি
এই মামলার দীর্ঘ শুনানির শেষে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছে:
কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পরেই নিরপেক্ষ তদন্ত বা বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কোনো নিরীহ ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে অযথা কোনো আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না, তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে, পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
আটক থাকা সমস্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোন ক্যামেরা, বডি ক্যাম, অন্যান্য ভিডিও ভিজ্যুয়াল এবং ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনের সমস্ত ডেটা সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং তা পরবর্তী তদন্তের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।