“শিউরে ওঠার মতো পরিস্থিতি”-অসমে এ বারের বন্যা কতটা ভয়াবহ? জানুন বিস্তারিত

প্রতিবারের চেনা ছবিকে ছাপিয়ে এবার আরও বেশি বিধ্বংসী রূপ নিয়েছে অসমের বন্যা পরিস্থিতি। আক্ষরিক অর্থেই রাজ্যের একটি বড় অংশ বর্তমানে জলের তলায়। অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA)-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গোটা রাজ্যে বর্তমানে সাড়ে ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ (প্রায় ৫ লক্ষ ২৪ হাজার) সরাসরি বন্যাকবলিত। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে দু’জনের মৃত্যুর খবর মেলায় চলতি বছরের বন্যাজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৮-তে পৌঁছেছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কোন কোন জেলা?

রাজ্যের একাধিক জেলা জলের তলায় চলে গেলেও বন্যায় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চরাইদেও এবং শিবসাগর জেলায়।

  • চরাইদেও: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই জেলায় ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৪০৪ জন মানুষ জলের বন্দি।

  • শিবসাগর: এখানে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬৪ জন।

  • যোরহাট: এই জেলায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭৭৫ জন মানুষ বন্যার কবলে পড়েছেন। এছাড়াও গোলাঘাট, হোজাই, কামরূপ, কামরূপ (মেট্রো), নগাঁও এবং ডিব্রুগড় জেলাতেও বন্যার প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজ্যজুড়ে মোট ৭৬৩টিরও বেশি গ্রাম সম্পূর্ণ জলের তলায় রয়েছে।

পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও চাষের জমির দশা

প্রাকৃতিক এই তাণ্ডবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে:

  • কৃষিজমি: বন্যায় প্রায় ৪৮,৭৪২.০৯ হেক্টর কৃষিজমি সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে গিয়েছে।

  • বাড়িঘর: সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্যায় ৫৭৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, ১,৬১১টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১,০৪২টি গোয়ালঘর ও অন্যান্য পরিকাঠামো নষ্ট হয়েছে।

  • গবাদি পশু: বন্যায় ৮৮,২৪০টি গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাঁস-মুরগি সহ মোট ২৬,৫১২টি পশু-পাখি বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে।

  • রাস্তাঘাট: রাজ্যের অন্তত ১০৫টি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত বা জলমগ্ন হয়েছে, যার ফলে শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাটের সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় যে এখনও পর্যন্ত কোনো বড় সেতু বা বাঁধ ভেঙে পড়ার খবর নেই।

উদ্ধারকার্য ও ত্রাণ বণ্টন

পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্যজুড়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে প্রশাসন:

  • উদ্ধারকারী দল: এসডিআরএফ (SDRF), এনডিআরএফ (NDRF), ভারতীয় সেনা এবং ভারতীয় বায়ুসেনার যৌথ দল উদ্ধারকাজে নেমেছে। মোট ১৫২টি মেডিক্যাল টিম, ৩৬টি নৌকা এবং ২টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।

  • ত্রাণ শিবির: প্রশাসন মোট ৩৫৪টি ত্রাণ শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র খুলেছে (যার মধ্যে ১০৯টি ত্রাণ শিবির ও ২৪৫টি বিতরণ কেন্দ্র রয়েছে)। বর্তমানে ৩৭,৭২৪ জন মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৮৩৩ জন মানুষ ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছেন।

  • ত্রাণ সামগ্রী: দুর্গতদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩,৩০২.৫৫ কুইন্টাল চাল, ৫৯০.৯৯ কুইন্টাল ডাল, ১৭৭.৩৮ কুইন্টাল লবণ, প্রায় ১৭,৭৩৬ লিটার সর্ষের তেল, পানীয় জল, ত্রিপল, হ্যালোজেন ট্যাবলেট, মশারি, স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশু খাদ্য এবং ব্লিচিং পাউডার বিতরণ করা হয়েছে।

সাহায্যের আর্জি গায়ক পাপনের

অসমের এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসীর কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন জনপ্রিয় গায়ক পাপন। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন ভিডিও পোস্ট করে তিনি জানান, এবারের বন্যা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে, বহু মানুষ গৃহহীন এবং গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে। ভিডিও বার্তায় পাপন সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমার বন্ধু, সহকর্মী এবং যাঁদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা যদি পারেন, অনুগ্রহ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *