পদত্যাগে রাজি ছিলেন না, কেন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরাল মোদী সরকার? নেপথ্যে ছিল কোন বড় রহস্য?

পরপর দু’বার নিজে থেকেই পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সময় সরকার তাঁর সেই আর্জি খারিজ করে সাফ জানিয়েছিল, সমস্যা থেকে পালিয়ে সমাধান হয় না, লড়াই করে তা মেটাতে হবে। অথচ শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান থেকে আক্ষরিক অর্থেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল নরেন্দ্র মোদী সরকার। শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হলো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে (Dharmendra Pradhan)। এমনকি কোনো রকম দীর্ঘ প্রস্তাব বা আলোচনা ছাড়াই সেই পদত্যাগপত্র সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণও করা হলো। প্রশ্ন উঠছে, এমন ঠিক কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যার জেরে মোদী সরকারকে নিজেদের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হলো?
দায়িত্ব থেকে পালানো নয়, ছিল কঠোর নির্দেশ
সূত্রের খবর অনুযায়ী, নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং ব্যাপক দুর্নীতির জেরে যখন দেশজুড়ে ছাত্রবিক্ষোভ চরমে পৌঁছায়, সেই উত্তাল পরিস্থিতি সামাল দিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজেই অন্তত দু’বার মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। গত ২০ জুলাই সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের একটি হাই-প্রোফাইল বৈঠকেও তিনি পদ ছাড়ার কথা বলেন। কিন্তু সেই সময় সরকার তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিল। তৎকালীন যুক্তি ছিল, পদত্যাগ করাটা অত্যন্ত সহজ একটি বিষয় এবং তা অনেকটা দায়িত্ব এড়ানোর শামিল। মোদী সরকার সমস্যা থেকে পালিয়ে বেড়াতে নয়, বরং তা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে বিশ্বাসী। তাই তাঁকে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
হঠাৎ কী এমন পরিস্থিতি বদলাল?
কিন্তু সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP-র সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফার আলোচনার পর। CJP স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, তাদের দাবিদাওয়া না মানলে গত ২০ জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ অভিযানের মতো আরও বড় ও কঠোর আন্দোলনের পথে নামবে তারা। উল্লেখ্য, ২০ তারিখের সেই বিক্ষোভে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের খণ্ডযুদ্ধে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছিলেন, যা নিয়ে সরকার আগে থেকেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ছিল।
পাকিস্তানের যোগ ও গোয়েন্দা রিপোর্টের উদ্বেগ
পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি জটিল করে তোলে দেশের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট। তদন্তে উঠে আসে যে, এই ছাত্র আন্দোলনকে সুচারুভাবে ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে কিছু দেশ-বিরোধী শক্তি।
ডিজিটাল নজরদারি ও পাক যোগ: সাইবার তদন্তে দেখা যায়, অন্তত ৪০০টি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে এই বিক্ষোভের আগুন তীব্র করে তোলার অপচেষ্টা চলছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, এর মধ্যে অন্তত ১০০টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সরাসরি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। এমনকি এই অ্যাকাউন্টগুলি এর আগে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়েও ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে ভুয়া খবর এবং ভারত-বিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত ছিল।
দাগি অপরাধীদের অনুপ্রবেশ: অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম’ (FRS) বা মুখ চেনার প্রযুক্তি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনে। পুলিশ জানতে পারে, ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে রাজধানীর যন্তর মন্তর চত্বরে প্রায় ৪০০ জন কুখ্যাত দাগি অপরাধী ঘোরাফেরা করছিল। এদের অনেকেই ২০ তারিখের হিংসাত্মক ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।
জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থেই বড় সিদ্ধান্ত
এই সমস্ত তথ্য সামনে আসার পর সরকারের কাছে এটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সাধারণ ছাত্র আন্দোলনের মোড় অন্য কোনো বিপজ্জনক দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং যন্তর মন্তর চত্বরে বড়সড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতেই শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হঠে। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই সমস্ত জট কাটিয়ে এই বড় পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।