ফ্রিজে রাখা আটার ডো কালো হয়ে গেলেই ফেলে দেন? মারাত্মক এই ভুলটি করার আগে জেনে নিন আসল সত্য!

রাতে আটা মেখে তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করে পরদিন সকালে নরম রুটি তৈরি করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু ফ্রিজ থেকে সেই ডো বা খামির বের করার পর প্রায়শই দেখা যায় যে, আটার ডো আর আগের মতো ধবধবে সাদা নেই, বরং তাতে একটা ধূসর কিংবা কালচে রঙের আস্তরণ পড়েছে। এই দৃশ্য দেখেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ভাবেন যে, আটা বোধহয় পচে নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা তা খাওয়ার পুরোপুরি অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তবে বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের বিন্দুমাত্র কোনো কারণ নেই। বরং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বা অর্গানিক গমের আটা হলে ডো-র এমন রং পরিবর্তন হওয়াটাই একেবারে স্বাভাবিক। এর সঙ্গে আটার পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়া বা খাবার অনিরাপদ হওয়ার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
আটার ডো কেন কালচে হয়ে যায়?
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গমের বাইরের শক্ত স্তর বা ভূষির মধ্যে ‘পলিফেনল অক্সিডেজ’ নামক একটি প্রাকৃতিক এনজাইম বা উৎসেচক উপস্থিত থাকে। যখন আটার সঙ্গে জল মিশিয়ে ভালো করে ডো তৈরি করা হয়, তখন থেকেই এই এনজাইমটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর সেই ডো ফ্রিজে রাখা হলে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে এনজাইমটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘এনজাইমেটিক ব্রাউনিং’, যার ফলে আটার রং ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে ধূসর বা কালচে রূপ নেয়।
ঠিক যেমন একটি আপেল কেটে কিছুক্ষণ খোলা বাতাসে ফেলে রাখলে তার ওপর বাদামি রঙের আস্তরণ পড়ে, আটার ডো-র ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে। অর্থাৎ, সামান্য রং বদলে গেলেই আটা নষ্ট হয়ে গেছে—এমনটা ভেবে ভুল করার কোনো অবকাশ নেই।
বাজারের সাধারণ আটায় এমনটা কম হয় কেন?
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বাজারের সমস্ত আটার ডো-তে কেন এমন কালচে ভাব দেখা যায় না? এর প্রধান কারণ হলো, বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক প্যাকেটজাত সাদা আটা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় গমের উপকারী বাইরের ভূষি এবং জার্ম অংশ অনেকটাই ছেঁকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে তাতে পলিফেনল অক্সিডেজ এনজাইমের পরিমাণও অনেক কমে যায়। এমনকি আটাকে দীর্ঘদিন আকর্ষণীয় ও সাদা দেখানোর জন্য অনেক সময় ব্লিচিং কিংবা নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়াও ব্যবহার করা হয়। এই কারণেই ওই সমস্ত আটার ডো সহজে কালচে হয় না, তবে এর চড়া মূল্যে গমের আসল প্রাকৃতিক ফাইবার বা আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের একটি বড় অংশও চিরতরে হারিয়ে যায়।
রং পরিবর্তন কমানোর সহজ উপায়
আপনি যদি চান যে ফ্রিজে রাখার পরেও আটার ডো তুলনামূলকভাবে সাদা ও সতেজ থাকুক, তবে অত্যন্ত সহজ একটি কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। ডো ভালোভাবে মাখার পর তার গায়ের চারধারে অল্প পরিমাণ রান্নার তেল বা ঘি বুলিয়ে দিন। এর ফলে ডোর ওপরে একটি পাতলা সুরক্ষামূলক আস্তরণ তৈরি হবে, যা বাতাসের অক্সিজেনকে সরাসরি আটার সংস্পর্শে আসতে বাধা দেবে।
পাশাপাশি, ডোটি সবসময় একটি ভালো মানের এয়ারটাইট কাচের বা প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে অক্সিডেশনের হার অনেক কমে যায় এবং খামিরের রং দীর্ঘ সময় ধরে একদম ঠিকঠাক থাকে। সংরক্ষণের সুবিধার জন্য ডো-কে ছোট ছোট অংশে ভাগ করেও রাখতে পারেন, যাতে বারবার তা বাতাস ও তাপমাত্রার সংস্পর্শে এসে নষ্ট না হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফ্রিজে রাখা আটার ডো কালচে হয়ে যাওয়া কোনো ত্রুটি বা পচনের লক্ষণ নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া মাত্র। বিশেষ করে খাঁটি ও সম্পূর্ণ গমের আটা ব্যবহার করলে এই পরিবর্তন আরও বেশি চোখে পড়ে। তাই কেবল রং কিছুটা বদলে গেছে বলেই কাজের আটা ফেলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে এই ডো সম্পূর্ণ নিরাপদভাবেই ব্যবহার করা যায় এবং এর ভেতরের পুষ্টিগুণও পুরোপুরি অটুট থাকে।