বারবার কেওয়াইসি জমা দেওয়ার দিন কি শেষ? ভারতে আর্থিক পরিষেবাকে আরও সহজ করতে আসছে ‘CKYC ২.০’

ভারতে সাধারণ মানুষের জন্য আর্থিক পরিষেবা এবং বিনিয়োগের প্রক্রিয়া আরও অনেক বেশি সহজ ও ঝঞ্ঝাটহীন হতে চলেছে। দেশের সরকার এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি যৌথভাবে সেন্ট্রাল নো ইয়োর কাস্টমার ২.০ (CKYC ২.০) ব্যবস্থা চালু করার জোরালো প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী আগস্ট মাস থেকেই দেশের ব্যাঙ্ক এবং বীমা সংস্থাগুলির মাধ্যমে এই নতুন ব্যবস্থার সূচনা হতে চলেছে এবং পরবর্তীতে এর পরিধি বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্রোকারেজ সংস্থাগুলিকেও এর আওতায় আনা হবে। এই উন্নত ব্যবস্থাটি চালু হলে গ্রাহকদের আর নতুন কোনো আর্থিক পণ্য কেনার সময় কিংবা আলাদা করে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় বারবার কেওয়াইসি (KYC) নথি জমা দেওয়ার ঝামেলার মুখে পড়তে হবে না।

অগাস্ট থেকে ব্যাঙ্ক ও বীমা কোম্পানিতে শুরু
রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিকেওয়াইসি ২.০-এর অধীনে গ্রাহকদের কেবল একবারই সম্মতি বা কনসেন্ট (Consent) দিতে হবে। এরপর ব্যাঙ্ক, বীমা কোম্পানি এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি সুরক্ষিত কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষিত যাচাইকৃত তথ্য সরাসরি অ্যাক্সেস করতে পারবে। এর ফলে যেকোনো নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, বীমা পলিসি কেনা কিংবা অন্যান্য আর্থিক পরিষেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি নাটকীয়ভাবে দ্রুত ও সহজ হয়ে উঠবে।

এই মেগা প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI), বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI) এবং বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI)। প্রথম ধাপে ব্যাঙ্ক ও বীমা সংস্থাগুলিকে যুক্ত করা হলেও, চলতি বছরের শেষ নাগাদ মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্রোকারেজ ফার্মগুলিকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন এই নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন?
বর্তমানে সাধারণ মানুষকে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে, বীমা পলিসি কিনতে বা অন্য কোনো আর্থিক পরিষেবা নিতে গেলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বারবার আলাদা করে কেওয়াইসি নথি জমা দিতে হয়। যদিও বর্তমানে প্রায় ১.২ বিলিয়ন রেকর্ড সম্বলিত একটি কেন্দ্রীয় কেওয়াইসি রেজিস্ট্রি ইতিমধ্যেই রয়েছে, তবুও সেখানে প্রায়শই নকল রেকর্ড, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং ডেটার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। যার ফলে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেই ডেটার ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারে না।

তবে CKYC 2.0 ব্যবস্থায় এই ত্রুটি দূর করতে প্রতিটি রেকর্ডের সাথে একটি বিশেষ ‘কনফিডেন্স স্কোর’ (Confidence Score) যুক্ত থাকবে। এই স্কোরটি দেখেই বোঝা যাবে যে গ্রাহকের তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য এবং পূর্বে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না। এছাড়া কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের রেকর্ড অ্যাক্সেস করতে চাইলে বাধ্যতামূলকভাবে একটি ওটিপি (OTP)-এর মাধ্যমে গ্রাহকের অনুমতি বা সম্মতি নিতে হবে।

জালিয়াতি প্রতিরোধ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিরাট ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আধুনিক ব্যবস্থাটি কেবল গ্রাহকদের দস্তাবেজ জমা দেওয়ার ভোগান্তিই কমাবে না, বরং বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি রোধ করতেও ম্যাজিকের মতো কাজ করবে। এক জায়গায় সম্পূর্ণ যাচাইকৃত তথ্য সুরক্ষিত থাকায় ভুয়া নথি ও নকল পরিচয়ের ঝুঁকি এক্কেবারে কমে যাবে।

এসবিআই ফান্ডস ম্যানেজমেন্টের যুগ্ম সিইও ডিপি সিং-এর মতে, সিকেওয়াইসি ২.০ মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের জন্য অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হতে পারে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-রই প্রায় ৫০ কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এই যোগ্য গ্রাহকদের মধ্য থেকে যদি উল্লেখযোগ্য একটি অংশও খুব সহজে বিনিয়োগ শুরু করতে পারেন, তবে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড মার্কেটে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা হু হু করে বৃদ্ধি পাবে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নতুন গতি
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্কের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেও, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা ও পেনশনের মতো বিভিন্ন আর্থিক পণ্যগুলিতে মানুষের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। তাই সরকারের বিশ্বাস, একটি সমন্বিত ও একক গ্রাহক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য যেকোনো ধরনের বিনিয়োগ ও বীমা পরিষেবা পাওয়া আরও অনেক সহজ করে তুলবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, CKYC 2.0 সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো ভারতও একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ডিজিটাল পরিচয়-ভিত্তিক আর্থিক পরিকাঠামোর দিকে আরও এক বিশাল মাইলফলক অর্জন করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *