সাদা পোশাকে পুলিশকর্মীদের ডিউটি ও গ্রেফতারির ক্ষমতা নিয়ে কী বলছে আইন? জানুন সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ

দিল্লির যন্তরমন্তরে ছাত্র বিক্ষোভ চলাকালীন সাদা পোশাকে পুলিশকর্মীদের উপস্থিতি ঘিরে ফের একবার জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে সাদা পোশাকের পুলিশ বা গোয়েন্দাদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন আন্দোলন বা বিক্ষোভের সময় সাদা পোশাকে থাকা বা নেমপ্লেটহীন পুলিশকর্মীদের পরিচয় নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এই সংক্রান্ত বহু রিলস ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

তাহলে আসল প্রশ্ন হলো—পুলিশকর্মীরা কি আদতে সাদা পোশাকে ডিউটি করতে পারেন? আইন এ বিষয়ে কী বলছে?

সাদা পোশাকে পুলিশকর্মীদের কাজ কি আইনসম্মত?
আইন অনুযায়ী, পুলিশকর্মীদের সব সময় বাধ্যতামূলকভাবে উর্দি পরেই ডিউটি করতে হবে—এমন কোনো নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। দেশের প্রায় সব থানাতেই বিভিন্ন বিশেষ প্রয়োজনে সাদা পোশাকে পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়। যেমন:

তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি চালানো

পুলিশের পরিচয় গোপন রেখে সুনির্দিষ্ট অপারেশন পরিচালনা

অ্যান্টি-ক্রাইম অপারেশন

ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং ভিআইপি বা ভিভিআইপি নিরাপত্তা রক্ষা

যে সমস্ত অভিযান বা তদন্তের ক্ষেত্রে অফিসারের পরিচয় আগেভাগে প্রকাশ্যে চলে এলে তদন্ত ব্যাহত হতে পারে, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা সাদা পোশাকেই দায়িত্ব পালন করেন।

সাদা পোশাকে থাকা পুলিশকর্মীরা কি কাউকে গ্রেফতার করতে পারেন?
হ্যাঁ, অবশ্যই পারেন। সাদা পোশাকে আছেন বলেই যে একজন পুলিশকর্মীর আইনি ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, তা কিন্তু নয়। আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাদা পোশাকে থাকা কোনো পুলিশকর্মী চাইলে—

কোনো অভিযুক্তকে আটক বা গ্রেফতার করতে পারেন

পরিস্থিতির প্রয়োজনে অভিযুক্তের ওপর যুক্তিগ্রাহ্য বলপ্রয়োগ করতে পারেন

জনতা বা ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন

তবে মনে রাখতে হবে, একজন উর্দিধারী পুলিশকর্মীকে আইনি প্রক্রিয়ার যে সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়, সাদা পোশাকে থাকা পুলিশকর্মীকেও ঠিক সেই একই শর্ত বা বিধিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়।

সাদা পোশাকে থাকা পুলিশকর্মীরা কি পরিচয় জানাতে বাধ্য?
সাদা পোশাকে থাকলেই যে একজন পুলিশকর্মীকে সবসময় নিজের পরিচয়পত্র বা নাম লেখা ব্যাজ গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে, আইনে এমন কোনো বাধ্যতামূলক কথা বলা নেই। তবে ভারতীয় আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাদা পোশাকে থাকা অবস্থায় কাউকে গ্রেফতার করতে গেলে কিংবা আইন প্রয়োগের জন্য বলপ্রয়োগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীকে অবশ্যই নিজের পরিচয় জানাতে হবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতেও এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশ কী বলছে?
পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন যেকোনো ধরনের হেনস্থা বা নির্যাতনের ঘটনা রুখতে ১৯৯৭ সালের ডি কে বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। বর্তমানে দেশে যেকোনো গ্রেফতারির ক্ষেত্রে সেই নির্দেশই মেনে চলা হয়। ওই রায়ে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছিল:

কাউকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ অফিসারকে স্পষ্ট ভাষায় নিজের পরিচিতি জানাতে হবে।

গ্রেফতারির নথিতে ওই পুলিশ অফিসারের সমস্ত বিস্তারিত তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে।

অ্যারেস্ট মেমো (Arrest Memo) তৈরি করার পাশাপাশি ধৃতের পরিবার বা পরিচিতদের দ্রুত খবর দিতে হবে।

ধৃত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল পরীক্ষা ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করতে হবে।

পরিচয় কি সম্পূর্ণ গোপন রাখা যায়?
একজন পুলিশ অফিসার যখনই তাঁর সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাউকে গ্রেফতার বা আইন প্রণয়নে কোনো পদক্ষেপ নেন, তখন তিনি যতই সাদা পোশাকে থাকুন না কেন, নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে আইনগতভাবে বাধ্য। হয় তাঁকে এমনভাবে থাকতে হবে যাতে তিনি পুলিশকর্মী তা দৃশ্যমান হয়, নয়তো প্রয়োজন সাপেক্ষে তাঁকে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতেই হবে। দেশের বিভিন্ন আদালতের রায়ে বারবার এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতাই হলো একমাত্র রক্ষাকবচ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *