স্যুপ খেয়ে ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন সোনম, কতদিন সময় লাগবে সুস্থ হতে?

দীর্ঘ ২৬ দিনের ম্যারাথন অনশনের পর অবশেষে ব্রতভঙ্গ করেছেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক। বর্তমানে তিনি গুরুগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্যুপ খেয়ে অনশন ভাঙলেও একটানা দীর্ঘ অনশনের কারণে তাঁর শরীর ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং তিনি তাঁদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর ২৬ দিনের অনশনের প্রভাব

পুষ্টিবিদ ও নিউট্রিশনিস্ট অনুশ্রী মিত্র-র মতে, টানা ২৬ দিন অনশন করার ফলে মানুষের শরীর ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ে শরীরে মারাত্মক মাত্রায় পেশি ক্ষয় (Muscle Loss), পুষ্টির ঘাটতি এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা (Electrolyte Imbalance) দেখা দেয়। এর জেরে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই দীর্ঘ অনশনের জেরে সোনম ওয়াংচুকের ওজন প্রায় ১১ কেজি কমে গেছে।

সুস্থ হতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে?

জেনারেল ফিজিশিয়ান ড. রুদ্রজিৎ পাল জানিয়েছেন, এত দীর্ঘ সময় উপোস থাকার পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে রোগীর মোটামুটি ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। তবে যে পরিমাণ পেশি ক্ষয় হয়েছে, তা পুরোপুরি ঠিক হতে প্রায় ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে। এই সংকটজনক সময়ে রোগীর ওপর কোনো রকম শারীরিক বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। তবে রোগীর বয়স এবং তাঁর শরীরে আগে থেকে অন্য কোনো জটিল রোগ বা কো-মরবিডিটি ছিল কি না, তার ওপরও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সময়সীমা নির্ভর করছে।

অনশন ভাঙার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক: ‘রিফিডিং সিন্ড্রোম’

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনশন ভাঙার পরবর্তী সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়ে ডায়েটের দিকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, উপোস ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে খাবার খেয়ে ফেললে রোগীর শারীরিক জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য ফের নষ্ট হয়ে হৃদযন্ত্রের (Heart) ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

পুষ্টিবিদ অনুশ্রী সতর্ক করে বলেছেন, অনশন ভাঙার পর হঠাৎ করে স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শুরু করলে এক মারাত্মক শারীরিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিফিডিং সিন্ড্রোম’ (Refeeding Syndrome) বলা হয়। এর জেরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে এবং রোগীর প্রাণসংশয়ের ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে।

কী ধরনের ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা হচ্ছে?

অনশন ভাঙার পরপরই রোগীকে কোনোভাবেই ভারী বা সলিড খাবার দেওয়া যায় না, কারণ সেই মুহূর্তে শরীর তা হজম করতে সম্পূর্ণ অক্ষম থাকে।

  • প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহ: প্রথম ১৪ দিন মূলত শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালান্স ফেরানো এবং ডিহাইড্রেশন কাটিয়ে হাইড্রেশন নিশ্চিত করার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়।

  • তরল খাবার: প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত কম ক্যালোরির তরল খাবার দেওয়া হয়। রোগীর অবস্থা দেখে ধীরে ধীরে ক্যালোরির পরিমাণ বাড়ানো হয়। রোগী নিজে মুখ দিয়ে খেতে না পারলে আইভি (IV) ড্রিপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, ওআরএস (ORS) বা ডাবের জল দেওয়া হয়।

  • খাবারের তালিকা: এই অবস্থায় মাছ, মাংস, ডিম বা অন্য কোনো কঠিন খাবার প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। পরিবর্তে চিকেন স্টু, ভাতের ফ্যান, ডালের স্যুপের মতো লিকুইড ডায়েটে রাখা হয়। ৫ থেকে ৭ দিন পর ধীরে ধীরে হালকা খিচুড়ি বা ডিম সেদ্ধর সাদা অংশ জাতীয় সেমি-সলিড খাবার ডায়েটে যোগ করা হয়।

বর্তমানে সোনম ওয়াংচুক সম্পূর্ণভাবে হাসপাতালের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তাঁর নিয়মিত ইলেক্ট্রোলাইট টেস্ট করা হচ্ছে এবং শারীরিক উন্নতির হার দেখে প্রতি মুহূর্তে তাঁর খাদ্যতালিকা বা ডায়েট পরিবর্তন করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *