“আমাকে বাঁচান ডাক্তার, অনেক কাজ বাকি!” বেলভিউয়ের বিছানায় ঠিক কী বলেছিলেন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো মহানায়ক?

সালটা ১৯৮০। ২৩ জুলাইয়ের এক টানা অঝোর শ্রাবণ ধারায় ভিজেছিল তিলোত্তমা। কিন্তু সেদিন শহরের অলিতে-গলিতে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, বৃষ্টিভেজা সেই রাতেই নিভে যেতে বসেছে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র শুটিং সেটে কাজ চলাকালীনই আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হন মহানায়ক উত্তম কুমার।
অদ্ভুত এক মানসিক জোর ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে সেই অবস্থাতেই তিনি শট শেষ করেন। একবিন্দু বুঝতে দেননি নিজের ভেতরে চলতে থাকা চরম যন্ত্রণার কথা। শুটিং ফ্লোর থেকে যখন তাঁকে দ্রুত বেলভিউ নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, গাড়িতে শুয়েই ক্রমাগত অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বিড়বিড় করছিলেন তিনি। কিন্তু ঝড়ের গতিতে ঘটে চলা সেই মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারেননি তাঁর মনের আসল আকুতি।
শেষ মুহূর্তের লড়াই ও ডাক্তারের স্মৃতিচারণা:
হাসপাতালে ভর্তির পর বিশিষ্ট চিকিৎসক ড. সুনীল সেনের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু লড়াইটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বেলভিউয়ের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ড. সেনের হাত ধরে আকুল কণ্ঠে কেবল একটাই কথা বার বার বলে চলেছিলেন উত্তম— “আমাকে বাঁচান ডাক্তার, অনেক কাজ বাকি!”
এর বহু বছর পর এক বিনোদন পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. সুনীল সেন স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, মহানায়ক বেশ কিছু দিন ধরেই তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। জীবনযাত্রায় কিছু বদল আনার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি হাসিমুখে কেবল বলতেন, “আমাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখুন।” ২৩ জুলাইয়ের সেই কালরাতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা উত্তমের চোখ ছিল আধা বোজা। হাসপাতালের বাইরে তখন ভক্তদের ঢল, আর রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভাই তরুণ কুমার। ডাক্তার সেনের কাছে জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়েও মহানায়ক কেবল বলে যাচ্ছিলেন, বাঁচতে চান তিনি!
বাঙালির হৃদয়ে অমর মহানায়ক:
কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। চিকিৎসকদের আপ্রাণ লড়াই এবং কোটি কোটি অনুরাগীর প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে টানা তিনবার হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। অবশেষে ২৪ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মহানায়ক। স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা বাংলা।
আজ তাঁর প্রস্থানের সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত। তবুও টলিউডের অন্দরে কিংবা অগণিত বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান একচুলও টলানো যায়নি। আজও প্রেক্ষাগৃহে ‘নায়ক’ মুক্তি পেলে হল থাকে হাউসফুল, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আজও বেঁচে রয়েছে তাঁর ক্যারিশম্যাটিক ম্যাজিক।