লাইসেন্স কোটার জাঁতাকলে রেকর্ড পতন! ভারতে রুপার আমদানি তলানিতে ঠেকতেই বাজারে কিসের হাহাকার?

নতুন সরকারি লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কঠোরড়ির জেরে ভারতে রুপার আমদানি নাটকীয়ভাবে এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে। এর জেরে স্থানীয় বাজারে রুপার প্রিমিয়াম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন যে, দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক এখনও এই মহামূল্যবান সাদা ধাতু আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমতি পায়নি এবং তারা সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এমনকি হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ব্যাংক এই ছাড়পত্র জোগাড় করতে পেরেছে।
উল্লেখ্য, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রুপার ভোক্তা রাষ্ট্র। গহনা তৈরি, রুপার থালা-বাসন বা সামগ্রী, শিল্পক্ষেত্রের নানা ব্যবহার এবং দেশের উৎসব ও বিবাহ অনুষ্ঠানে রুপার চাহিদা আকাশছোঁয়া। তবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রায় নগণ্য হওয়ায়, দেশটি বৈদেশিক আমদানির জন্য সম্পূর্ণরূপে ব্যাংক ও অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই আমদানি প্রক্রিয়াই বর্তমানে তীব্র প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে গেছে।
আমদানি কমল ঠিক কী পরিমাণে?
প্রখ্যাত পরামর্শক সংস্থা ‘মেটালস ফোকাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার জন্য সরকার গত মে মাসে রুপা আমদানির ক্ষেত্রে নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানির ওপর—যেখানে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও ৭৪৭ টন রুপা আমদানি হয়েছিল, জুনে তা কমে মাত্র আনুমানিক ২৯ টনে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ জুনের এই মোট চালান দেশের মোট বার্ষিক চাহিদার ১ শতাংশেরও কম।
মেটালস ফোকাসের প্রধান পরামর্শক হর্ষাল বারোটের মতে, এই বিশাল সরবরাহ ঘাটতির কারণে বেঞ্চমার্ক মূল্যের ওপর ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ বা প্রিমিয়াম অন্তত ২০১৯ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুম্বাইয়ের শীর্ষস্থানীয় সোনা-রুপা ব্যবসায়ী সংস্থা ‘অগমন্ট এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড’-এর গবেষণা প্রধান রেনিশা চেইনানি জানিয়েছেন, হঠাৎ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে ভৌত রুপার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে, অথচ সাধারণ মানুষের চাহিদা আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ বাজারের এই প্রিমিয়ামগুলো এখন একপ্রকার ‘দুর্লভতার’ পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মনে বাড়ছে বিভ্রান্তি
গোটা বিষয়টিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এক সরকারি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, আমদানি লাইসেন্স অনুমোদনকারী কমিটি মাসে মাত্র এক বা দুবার বৈঠকে বসে, যার ফলে ফাইল অনুমোদনে দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, নতুন এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো থাইল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) থাকা দেশগুলো থেকে অতিরিক্ত রুপা আমদানি ঠেকানো।
তবে লাইসেন্সিংয়ের এই নতুন নিয়ম ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাঁদের অভিযোগ, কোটা কীভাবে বরাদ্দ করা হচ্ছে বা এর মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই। উপরন্তু, মাত্র দু’মাস আগে চালু হওয়া নতুন ‘সার্টিফিকেট অফ অরিজিন’-এর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, রুপার আমদানি বর্তমানে কঠোরভাবে ‘সীমাবদ্ধ আমদানি’ বিভাগের আওতাভুক্ত এবং সমস্ত আবেদন প্রচলিত নিয়ম মেনেই যাচাই করা হচ্ছে।
উৎসবের মরশুমের আগে বড় সংকটের আশঙ্কা
এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রুপির মান রক্ষা করতে সোনা ও রুপার ওপর আমদানি শুল্ক দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছিল। বর্তমানের এই নতুন লাইসেন্সিং নীতি সেই শুল্কবৃদ্ধিরই পরবর্তী পদক্ষেপ। তবে সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দিয়েছে উৎসবের মরশুম নিয়ে। সাধারণত জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা অক্টোবর-নভেম্বরের দীপাবলি উৎসব এবং নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চলা জমজমাট বিয়ের মরশুমের জন্য ঠিক জুলাই মাস থেকেই স্টক বা মজুত ভরাট করা শুরু করেন। অগমন্ট এন্টারপ্রাইজের বিশেষজ্ঞ রেনিশা চেইনানির সতর্কবার্তা, বিয়ের ভরা মরশুমে চাহিদা বহুগুণ বাড়ার মুখে এই আমদানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।