‘আমি এখনও বেঁচে আছি!’ হাসপাতালের বিছানা থেকে ভিডিও বার্তায় কাঁপিয়ে দিলেন অনশনরত সোনম ওয়াংচুক

অসুস্থ শরীরে হাসপাতালের বিছানা থেকেই ভেসে এল সেই পরিচিত ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর— “আমি এখনও বেঁচে আছি।” দীর্ঘ ২৫ দিন ধরে আমরণ অনশন চালিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে মুখ খুললেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। বর্তমানে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশের মানুষের উদ্দেশে একটি ৩ মিনিটের আবেগঘন ভিডিও বার্তা দিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিওতেই তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারের তরফে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনওরকম আইনি পদক্ষেপ, গ্রেফতার বা হেনস্থা না করার স্পষ্ট ও লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া হলেই কেবল তিনি অনশন প্রত্যাহার (Sonam Wangchuk hunger strike) করবেন।

হাসপাতালের বিছানা থেকে আবেগঘন বার্তা
গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎই শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হওয়ায় সোনম ওয়াংচুককে দ্রুত গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাঁকে চিকিৎসকদের কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, এই দীর্ঘ টানা অনশনের জেরে তাঁর শরীর থেকে প্রায় ১১ কেজি ওজন কমে গেছে এবং পেশীর ক্ষয়ও হয়েছে অত্যন্ত মারাত্মক পর্যায়ে। তবে এত শারীরিক কষ্ট ও অসুস্থতার পরেও তিনি মানসিকভাবে আগের মতোই সম্পূর্ণ দৃঢ় রয়েছেন এবং চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন।

গত সোমবারের ‘চলো সংসদ’ অভিযানে শামিল হওয়া তরুণ শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা, ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ওয়াংচুক। তিনি বলেন, “যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী এই আন্দোলনে অসাধারণ সংযম দেখিয়েছেন, আমি তাঁদের কুর্নিশ জানাই। পুলিশের ভয়াবহ লাঠিচার্জের মুখোমুখি হয়েও তাঁরা কোনও হিংসাত্মক পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাননি। আন্দোলনকারী তরুণদের ওপর এমন নৃশংস পদক্ষেপ দেখার পরেই আমি আমার অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে আরও বেশি শক্ত করি।” শিক্ষার্থীদের এই অতুলনীয় সংযমই তাঁর এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পথকে নতুন করে বল জুগিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনশন ভাঙার কড়া শর্ত ও সরকারের উদ্দেশে বার্তা
সরকারি তরফ থেকে ইতিপূর্বেই একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও প্রথম সারির রাজনীতিকরা ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শাসকদলের মন্ত্রী-সহ একাধিক নেতা আমাকে অনশন ভঙ্গ করার আবেদন জানিয়েছেন। আমিও নিজের কাজে ফিরতে চাই, কারণ দেশ ও সমাজের জন্য আমার কাজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারের কাছে আমার আকুল অনুরোধ, দয়া করে শিক্ষার্থীদের ওপর গায়ের জোর প্রয়োগ করবেন না। আন্দোলনকারী কোনও তরুণের বিরুদ্ধে যেন এফআইআর, গ্রেফতার বা আইনি হেনস্থা না করা হয়—এই লিখিত নিশ্চয়তা পেলেই আমি আজই অনশন তুলে নেব। তা না হলে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”

ভিডিও বার্তার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংকে একটি সুনির্দিষ্ট চিঠিও পাঠিয়েছেন ওয়াংচুক। হাসপাতালে এসে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া এবং অনশন ভাঙার অনুরোধ জানানোর জন্য দুই মন্ত্রীকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে সেই চিঠিতেও আন্দোলনকারী তরুণদের সুরক্ষার দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি লিখেছেন, একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে সোচ্চার হওয়া ছাড়া এই তরুণদের আর কোনও ‘অপরাধ’ ছিল না। তাই কেবল প্রতিবাদের আওয়াজ তোলার জন্য তাঁদের ওপর যেন কোনও প্রতিশোধমূলক আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ৬৫ জন সাংসদও ওয়াংচুককে চিঠি লিখে বা ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

২৬ দিনে পড়ল সোনম ওয়াংচুকের অনশন
গত ২৮ জুন থেকে টানা অনশনে বসেছেন সোনম ওয়াংচুক। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই দেশজোড়া প্রতিবাদের মূল দাবিগুলো ছিল— কেন্দ্রীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে হওয়া বিভিন্ন অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি, শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুলিশের তরফ থেকে আন্দোলনকারীদের প্রতি কোনওরকম আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার নতুন শর্ত। এই সমস্ত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে গিয়েই আজ, বৃহস্পতিবার ২৬তম দিনে এসে পৌঁছেছে তাঁর এই ঐতিহাসিক আমরণ অনশন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *