একই গ্রামে ঢুকলেই সব ডবল ডবল দেখছেন? কেরলের এই ‘যমজ রহস্যময়’ গ্রামে লুকিয়ে রয়েছে কোন ভিনগ্রহের সূত্র!

কেরলের মালাপ্পুরাম জেলার শান্ত, নারকেল গাছ ঘেরা জলাভূমি অঞ্চলে অবস্থিত কোডিনহি (Kodinhi) গ্রাম। বাইরে থেকে দেখলে এই জনপদকে দক্ষিণ ভারতের অন্য দশটি সাধারণ ও শান্ত গ্রামের মতোই মনে হবে। কিন্তু এই গ্রামের রাস্তায় পা রাখলেই আপনার মনে হতে বাধ্য যে আপনি কোনো জাদুকরী দুনিয়ায় প্রবেশ করেছেন, যেখানে সবকিছুই যেন জোড়ায় জোড়ায় রয়েছে!

মাত্র প্রায় ২,০০০ পরিবারের এই গ্রামে বর্তমানে ৪০০ জোড়ারও বেশি যমজ সন্তান রয়েছে। পরিসংখ্যানের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, এখানকার এই যমজ জন্মের হার বিশ্ব গড়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ এবং ভারতের জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি।

পরিসংখ্যান যা বলছে: সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম কোডিনহি
বিশ্বব্যাপী যমজ জন্মের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলেই কোডিনহির এই অদ্ভুত ঘটনাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

বিশ্ব গড়: প্রতি ১,০০০টি জন্মের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৯টি যমজ শিশুর জন্ম।

ভারতের গড়: প্রতি ১,০০০টি জন্মের মধ্যে প্রায় ৪ থেকে ৯টি যমজ শিশু (যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন হার)।

কোডিনহির হার: প্রতি ১,০০০টি জন্মের মধ্যে বিস্ময়করভাবে ৪৫৫ থেকে ৫০টি যমজ জন্মের ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০০৮ সালে যেখানে এই গ্রামে প্রায় ২৮০ জোড়া যমজ সন্তানের সন্ধান মিলেছিল, সাম্প্রতিক গণনা অনুযায়ী সেই সংখ্যা এখন ৪০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। যে গ্রামে বছরে গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি শিশু জন্ম নেয়, সেখানে গর্ভাবস্থার একটি বিশাল অংশে একাধিক সন্তানের জন্ম এক বিরাট বিস্ময়।

গবেষকদের হতবাক করা তিনটি রহস্য
জার্মানি, লন্ডন এবং হায়দ্রাবাদের সিএসআইআর-সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (CCMB)-এর আন্তর্জাতিক জিনতত্ত্ববিদ, মহামারী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা এই গ্রাম থেকে ডিএনএ, জল ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা চালিয়েছেন। তা সত্ত্বেও, প্রচলিত কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিয়েই এই অস্বাভাবিক ঘটনার সঠিক কারণ এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের হতবাক করা প্রধান তিনটি বিষয় হলো:

১. ‘ইনব্রিডিং’ বা বংশগত বিবাহের ফল নয়: সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় যমজ জন্মের হার বেশি হওয়ার পেছনে ‘এন্ডোগামি’ বা একই বংশ বা ক্ষুদ্র জিন-ভাণ্ডারের মধ্যে বিবাহের ভূমিকা থাকে। কিন্তু কোডিনহির ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটছে না। এখানকার স্থানীয় মহিলারা যখন গ্রামের বাইরের পুরুষদের বিয়ে করে দূরে চলে যান, তখনও তাঁদের গর্ভে যমজ সন্তান জন্ম নেয়। আবার বিপরীতভাবে, বাইরের কোনো নারী কোডিনহির পুরুষকে বিয়ে করে গ্রামে এসে বসবাস শুরু করলেও তাঁদের যমজ সন্তান হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

২. সাম্প্রতিককালের সূচনা: গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, তিন প্রজন্ম আগেও যমজ সন্তানের জন্ম ছিল একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। জানা যায়, এই অদ্ভুত প্রবণতাটি মূলত আজ থেকে তিন-চার দশক আগে (১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে) হঠাত করেই শুরু হয়। সেই সময় গ্রামে জন্ম নেওয়া যমজ বোনেরা লক্ষ্য করেন যে আশেপাশের পরিবারগুলোতে হুবহু দেখতে একই রকম (আইডেন্টিক্যাল) যমজ শিশুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে।

৩. জল ও খাদ্যাভ্যাসের রহস্য: স্থানীয় ভূগর্ভস্থ জলে এমন কোনো রাসায়নিক উপাদান, কীটনাশক বা ভারী ধাতু রয়েছে কি না, যা প্রাকৃতিকভাবে ‘হাইপার-ওভুলেশন’ বা ডিম্বাশয় থেকে একাধিক ডিম্বাণু নিঃসরণকে প্রভাবিত করে—তাও খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া এখানকার চাল, কাসাভা, নারিকেল ও মাছের মতো সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরের প্রতিবেশী গ্রামগুলির খাদ্যাভ্যাসের তুলনা করা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, এখানকার মাটি, জল ও খাবার কেরলের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সাধারণ, অথচ প্রতিবেশী গ্রামগুলিতে যমজ সন্তান জন্ম নেওয়ার হার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *