ভাঙনের একুশে ভিন্ন ছবি! কোন শিবিরে মিলছে চেনা ‘ডিম-ভাত’, আর কোথায় পাতে পড়ছে না কিছুই?

এবারের একুশে জুলাইয়ের (21 July) রাজনৈতিক লড়াই কেবল রাজনৈতিক মঞ্চ বা স্লোগানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং নজর কেড়েছে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি। শাসক দলের ভাঙন ও রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে এবার শহিদ দিবসে পৃথক আলাদা কর্মসূচি পালন করছে কালীঘাট তৃণমূল, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির এবং কংগ্রেস। আর সেই কারণেই সমাবেশে যোগ দিতে দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার কর্মী-সমর্থকদের জন্য কোন শিবির ঠিক কী ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রেখেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুঙ্গে উঠেছে চর্চা।

ডিম-ভাতের পুরনো প্রথা ও কালীঘাট শিবিরের অবস্থান
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ দলটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই এই দিবসের সূচনা হয়েছিল এবং রাজ্যে সরকার আসার পর এর কলেবর আরও বৃদ্ধি পায়। অতীতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কর্মীদের থাকার পাশাপাশি খাওয়াদাওয়ার বিশাল আয়োজন করত দল। বিশেষ করে কর্মীদের জন্য পাতে ‘ডিম-ভাত’ পরিবেশন করা একরকমের ঐতিহাসিক প্রথায় পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছবিটা একেবারেই আলাদা। আদালতের নির্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূল শিবির বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে সভা করার অনুমতি পেলেও সেখানে সর্বাধিক আড়াই হাজার মানুষের জমায়েতের কড়া শর্ত রয়েছে। আর এই কারণেই সীমিত পরিসরের জেরে এবার কর্মী-সমর্থকদের জন্য বড় আকারে কোনো খাবারের আয়োজন রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কালীঘাট শিবির। যদিও খাবার না থাকলেও কর্মীদের উৎসাহ ও আবেগ যে বিন্দুমাত্র কমেনি, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন দলের নেতারা। কালীঘাট তৃণমূলের নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় বলেন, “একুশে জুলাই মানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস মানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা রয়েছে।”

ঋতব্রত শিবিরের মেনু: সেই চেনা ডিম-ভাত
অন্যদিকে, কালীঘাট শিবিরের উলটো পথে হেঁটে পুরোনো ঐতিহ্যকেই জিইয়ে রাখছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির। তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, সমাবেশে অংশ নিতে আসা কর্মী-সমর্থকদের জন্য সেই সুপরিচিত ‘ডিম-ভাত’-এর ব্যবস্থাই রাখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পাতে রাখা হচ্ছে পুষ্টিকর সয়াবিনের তরকারিও। অর্থাৎ, অতীতে তৃণমূলের শহিদ দিবসের যে সুনির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা বা মেনু ছিল, তাকেই এবার ধরে রাখছে এই শিবির।

কংগ্রেস শিবিরের ভিন্নধর্মী আয়োজন
এবারের একুশে জুলাইয়ে কংগ্রেসও যেহেতু আলাদাভাবে শহিদ মিনার চত্বরে বড় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তাই তাদের অতিথি আপ্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার দিকেও অনেকের নজর রয়েছে। দলের অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, কর্মী-সমর্থকদের থাকার স্থান ভেদে মেনুতেও ভিন্নতা আনা হয়েছে:

হরিয়ানা ভবন বা মাহেশ্বরী ভবনের মতো বিভিন্ন ধর্মশালায় যেসব কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের জন্য সম্পূর্ণ নিরামিষ রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেনুতে থাকছে ভাত, ডাল এবং পাঁচমিশেলি সবজির তরকারি। একই ধরনের নিরামিষ বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে কলকাতা পুরনিগমের অতিথিশালাগুলিতেও।

তবে সল্টলেক স্টেডিয়ামে ঠাঁই পাওয়া কর্মীদের মেনু রাখা হয়েছে কিছুটা আলাদা ও ভারী। সেখানে স্থানীয়ভাবে ভাত, ডালের পাশাপাশি মাছ ও ডিমের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার সকালে কর্মীদের জন্য টোস্ট এবং পাউরুটির জলখাবারের ব্যবস্থাও রেখেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।

রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের দেখভাল ও পেটপুজোকে কেন্দ্র করে এবারের একুশে জুলাইয়ে যে ত্রিমুখী ছবি ফুটে উঠেছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। কোথাও পুরনো ডিম-ভাতের ঐতিহ্য সগর্বে বজায় থাকছে, কোথাও আবার বাধ্যবাধকতার জেরে খাবারের বন্দোবস্তই নেই—সব মিলিয়ে একুশের ময়দানের পাশাপাশি এই ভিন্নধর্মী আয়োজনও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *