ভারতের বৃহত্তম পরমাণু কেন্দ্রের গোপন ব্লুপ্রিন্ট ফাঁস ডার্ক ওয়েবে! এ কী করল হ্যাকাররা?

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সাইবার সুরক্ষায় বড়সড় ধাক্কা। দেশের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র তামিলনাড়ুর কুডানকুলাম নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের (KKNPP) বিপুল পরিমাণ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন নথি ফাঁস হয়ে গেল ডার্ক ওয়েবে। একটি আন্তর্জাতিক র্যানসমওয়্যার (Ransomware) হ্যাকার গোষ্ঠী এই সাইবার হামলার নেপথ্যে রয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে। ফাঁস হওয়া নথিপত্রের মধ্যে এই পরমাণু কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশের প্রকৌশল ব্লুপ্রিন্ট, সরবরাহকারীদের তালিকা, যন্ত্রপাতির মূল্যায়ন এবং বিমা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রয়েছে বলে জানা গেছে। হ্যাকার গোষ্ঠীর দাবি, এই তথ্যগুলি তারা হাতিয়েছে অনিল আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপের সার্ভার থেকে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরমাণু শক্তি বৃদ্ধির মহাপরিকল্পনায় তামিলনাড়ুর এই কুডানকুলাম প্রকল্পটি অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ফলে এই তথ্য ফাঁসের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
আংশিক তথ্য ফাঁসের কথা স্বীকার করল রিলায়েন্স
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে অনিল আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপ ঘটনার সত্যতা আংশিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। রিলায়েন্সের তরফে জানানো হয়েছে, ভারতের একটি নামী থার্ড-পার্টি ডেটা সেন্টার পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘Yotta’-র হোস্ট করা তাদের একটি সার্ভার থেকে কিছু তথ্য আংশিক লিক হয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে রিলায়েন্স কর্তৃপক্ষ। তবে ঠিক কোন কোন সংবেদনশীল তথ্য সেখানে ছিল, তা খোলসা করেনি তারা।
ঠিক কী কী তথ্য এসেছে প্রকাশ্যে?
হ্যাকার গ্রুপ ‘World Leaks’-এর ডার্ক ওয়েব পোর্টালে রিলায়েন্সের প্রায় ৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ফাইলের হদিস মিলেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯,০০০ ফাইলকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাঁস হওয়া তথ্যের তালিকায় রয়েছে:
-
কুডানকুলামের নির্মাণাধীন ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের ভেন্টিলেশন ও কুলিং সিস্টেমের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্লুপ্রিন্ট।
-
একটি কমন কন্ট্রোল রুমের সম্ভাব্য ফ্লোর লেআউট।
-
অনুমোদিত সরবরাহকারীদের তালিকা ও যৌথ পরিদর্শনের নথিপত্র।
-
একটি নথিতে তো এমনকি এও দাবি করা হয়েছে যে, ৩ বা ৪ নম্বর ইউনিটে কোনও জঙ্গি হামলা বা নাশকতা হলে ১১ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিমা সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
কতটা গুরুতর এই ফাঁসের ঘটনা?
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ (NTI)-এর সিনিয়র ডিরেক্টর নিকোলাস রথের মতে, যদি এই নথিগুলি একশ শতাংশ আসল হয়, তবে তা এই পরমাণু কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও রয়টার্স জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া নথিগুলি ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের। তবে এর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একটি স্বস্তির বিষয় হলো, প্রকাশিত এই নথিপত্রে মূল নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ভেতরের কোনও নকশা নেই। কারণ ওই রিঅ্যাক্টরের মূল প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’। তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মূল নকশা না থাকলেও সহায়িকা পরিকাঠামো এবং কুলিং সিস্টেমের নকশা হাতে পেলে শত্রুপক্ষ বা কোনও হামলাকারী সহজেই এই প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে ছক কষে ফেলতে পারে।
তদন্তে নামল দেশের সাইবার ক্রাইম দমন শাখা
ইতিমধ্যেই ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ সংস্থা ‘Nuclear Power Corporation of India’ (NPCIL) রিলায়েন্সের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে জরুরি যোগাযোগ করেছে। পাশাপাশি দেশের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী শীর্ষ সংস্থা CERT-In পুরো ঘটনার জোরদার তদন্ত শুরু করেছে।
অন্যদিকে Yotta-র দাবি, গত ২৯ মে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ওই সার্ভারে একটি সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়তেই তারা দ্রুত পদক্ষেপ করে সম্ভাব্য র্যানসমওয়্যার হামলা রুখে দিয়েছিল। কিন্তু জুনের শেষে জানা যায়, হুমকিদাতারা ইতিমধ্যেই ডেটা ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ২০১৮ সালে কুডানকুলামের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট তৈরির চুক্তি পেয়েছিল, যা ২০২৭ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেও ২০১৯ সালে এই কুডানকুলাম প্ল্যান্টের প্রশাসনিক নেটওয়ার্কে উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর ম্যালওয়্যার হামলা রুখে দিয়েছিল প্রশাসন। তবে এবারের ডার্ক ওয়েব লিক ভারতের সাইবার সুরক্ষার ঢালকে যে আরও মজবুত করার তাগিদ দিচ্ছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।