‘যতটুকু মাইনে, ঠিক ততটুকুই কাজ!’ কর্পোরেট দুনিয়ায় কেন কমছে কর্মীদের বাড়তি উৎসাহ?

বর্তমান কর্পোরেট কর্মসংস্কৃতিতে এক বড়সড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরে বাড়তি পরিশ্রম বা ‘স্বেচ্ছামূলক প্রচেষ্টা’ (Discretionary Effort) এখন অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন কর্মীরা। ‘গ্রেট প্লেস টু ওয়ার্ক ইন্ডিয়া ২০২৬’-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এই প্রবণতাকে ‘এফর্ট রিশেসন’ (Effort Recession) বলে অভিহিত করা হয়েছে। ভারতের প্রায় ৬৩ শতাংশ সংস্থাতেই কর্মীদের বাড়তি উৎসাহ গড়ে ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
কী এই ‘স্বেচ্ছামূলক প্রচেষ্টা’? সহজ কথায়, যে কাজগুলো করার জন্য চুক্তিপত্রে বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু অফিসের স্বার্থে বা দলের প্রয়োজনে কর্মীরা নিজের তাগিদে করে থাকেন—যেমন টিমের কাউকে সাহায্য করা, সময়ের পরেও কাজ শেষ করা বা বাড়তি দায়িত্ব নেওয়া। বর্তমান কর্মীরা এখন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন—বেতন আর কাজের পরিমাণ একে অপরের পরিপূরক, এর বাইরে বাড়তি চাপ নিতে তাঁরা নারাজ।
কোন ক্ষেত্রে প্রভাব বেশি?
-
রিটেইল সেক্টর: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ৮৮% কোম্পানি কর্মীদের আগ্রহ কমার কথা জানিয়েছে।
-
তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা: ৭৭% কোম্পানি এই পতন অনুভব করছে।
-
নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট: ৭১% ক্ষেত্রে এই সমস্যা বিদ্যমান।
-
ম্যানুফ্যাকচারিং: তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, এখানে পতনের হার মাত্র ৩%।
ম্যানেজারদের ব্যর্থতা না কি নেতৃত্বের সংকট? সমীক্ষা বলছে, সমস্যাটি কর্মীদের দক্ষতার নয়, বরং তাঁদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আচরণের। যে সব জায়গায় কর্মীরা প্রশংসিত হন এবং ম্যানেজারদের আন্তরিক যত্ন পান, সেখানে বাড়তি পরিশ্রম করার ইচ্ছা থাকে ৯৯%। কিন্তু প্রশংসার অভাব হলে তা নেমে আসে ২৯%-এ। একইভাবে, অনুপ্রেরণাদায়ক নেতৃত্ব থাকলে কাজের গতি বজায় থাকে ৯৮%, অথচ নেতৃত্বের অভাব থাকলে তা দ্রুত ৩২%-এ নেমে আসে। কোম্পানিগুলো প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা বৃদ্ধিতে যত টাকা খরচ করে, তার তুলনায় কর্মীদের মানসিক প্রেরণা যোগাতে ব্যর্থ হওয়াই এখন বড় মাথাব্যথার কারণ।
জেন জি ও এআই-এর প্রভাব এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে দুটি বড় কারণ—প্রজন্মের ব্যবধান এবং এআই-এর অনুপ্রবেশ। ভারতীয় কর্মশক্তির ২৬ শতাংশই এখন ‘জেন জি’। আর একদিকে এই নতুন প্রজন্মের মানসিকতা বোঝা এবং অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানো—এই দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছেন এইচআর (HR) কর্মকর্তারা। প্রায় ৫০% এইচআর স্বীকার করেছেন, নতুন প্রজন্মের মিলেনিয়ালদের প্রেরণার উৎস সম্পর্কে তাঁরা এখনও সন্দিহান।
প্রতিবেদনটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: পুরোনো নেতৃত্ব কাঠামো আর আধুনিক কর্মীবাহিনীর চাহিদার মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কর্মীরা কেবল চাকরিই ছাড়ছেন না, বরং তাঁরা তাঁদের অতিরিক্ত পরিশ্রম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন কারণ তাঁরা মনে করছেন, সংস্থা বা নেতারা তাঁদের প্রতি উদাসীন। কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—কর্মীদের কেবল ‘প্রসেস’ না ভেবে মানুষ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া।