১০০ কোটির বেনামি সম্পত্তি? ক্ষমতার দাপট থেকে জেল, কেমন ছিল দেবরাজের উত্থান?

জমি দখল, আর্থিক দুর্নীতি এবং তোলাবাজির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগে অবশেষে পুলিশের জালে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর ও তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তী। পুরুলিয়া হয়ে ঝাড়খণ্ডে পালানোর সময় পুলিশের তৎপরতায় গ্রেফতার হলেন সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সির স্বামী। একদা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর আপ্তসহায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা দেবরাজের এই রকেট গতির উত্থান এবং আকস্মিক পতন এখন রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের মাধ্যমে হাইকোর্টে রক্ষাকবচ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন দেবরাজ ও তাঁর স্ত্রী অদিতি মুন্সি। আদালত অদিতিকে শিশুসন্তানের দেখভালের জন্য আগাম জামিন দিলেও, দেবরাজের ক্ষেত্রে তা মঞ্জুর হয়নি। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পুলিশের নাগাল এড়াতে তিনি পুরুলিয়া সীমান্ত দিয়ে ঝাড়খণ্ডে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশের জালে ধরা পড়ে তাঁর সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
শূন্য থেকে ১০০ কোটির সাম্রাজ্য
দেবরাজ চক্রবর্তীর রাজনৈতিক উত্থান ছিল নাটকীয়:
শুরুর পথ: প্রাক্তন মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর হাত ধরে রাজনীতিতে আসা। তবে পরে পূর্ণেন্দুর সঙ্গেই তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়।
তৃণমূলে কামব্যাক: কংগ্রেসের টিকিটে জিতেও পুনরায় তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন এবং দলের ভেতরে নিজের জায়গা তৈরি করা।
অভিষেকের ঘনিষ্ঠবৃত্ত: উত্তর ২৪ পরগনা যুব তৃণমূলের সভাপতি হওয়ার পর থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান দেবরাজ। দমদম-ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
বকলমে বিধায়ক: ২০২১ সালে স্ত্রী অদিতি মুন্সি বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই এলাকার রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাজকর্মের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে দেবরাজের হাতে।
দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড়
সিবিআই ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অভিযোগ, ১০০ কোটিরও বেশি টাকার আয়বহির্ভূত সম্পত্তির মালিক তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি লম্বা:
হলফনামায় গোপনীয়তা: কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী হলফনামায় তা গোপন করা।
টাকা লেনদেন: বিহারের রাম শর্মা নামের এক ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগ।
জমি দখল ও সিন্ডিকেট: বিভিন্ন এলাকায় জোর করে জমি দখল, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আইনি জালে: শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইতিমধ্যেই সিবিআই তল্লাশি চালিয়েছে তাঁর বাড়িতে। বিচারপতি জয় সেনগুপ্তও তাঁর করা ব্যবসায়িক চুক্তি ও হলফনামার বিষয়টিকে ‘চতুর পরিকল্পনা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বর্তমানে গ্রেফতারের পর দেবরাজ চক্রবর্তীকে জেরা করে এই দুর্নীতির জাল কতদূর বিস্তৃত, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে তৃণমূলের একসময়ের দাপুটে নেতার এই পতন রাজ্য রাজনীতিতে যে বড়সড় ধাক্কা, তা বলাই বাহুল্য।