অমরত্বের সন্ধানে হিমালয়ের দুর্গম যাত্রা: শিব-পার্বতীর সেই গোপন কথা কী ছিল?

হিমালয়ের কোলে ১৩,৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত অমরনাথ গুহা। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে এই তীর্থস্থানে বরফের শিবলিঙ্গ দর্শন করতে ভিড় করেন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। কিন্তু এই যাত্রার পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ত্যাগের এক পৌরাণিক কাহিনি।
কেন শিব পার্বতীকে নিয়ে গুহায় লুকিয়েছিলেন? পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দেবী পার্বতী একদিন মহাদেবকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি অমর, তবে আমি কেন জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ?” শিব তাঁকে অমরত্বের গোপন কথা বা ‘অমরকথা’ শোনানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শর্ত ছিল, এই কথা যেন কোনো সাধারণ প্রাণী বা দেবতা শুনতে না পায়। তাই নির্জন জায়গা খুঁজতে বেরিয়ে শিব একে একে তাঁর সব প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ করেছিলেন।
যাত্রাপথের ৫টি ত্যাগের প্রতীক: অমরনাথ যাত্রার প্রতিটি স্টপেজ মূলত মোহ-মায়া ত্যাগের নির্দেশ দেয়:
-
পহেলগাঁও: এখানে শিব তাঁর বাহন নন্দীকে ত্যাগ করেছিলেন।
-
চন্দনবাড়ি: এখানে তিনি মাথার চন্দ্রকে খুলে রাখেন।
-
শেষনাগ: এখানে গলার সাপ বা বাসুকি নাগকে ছেড়ে আসেন।
-
পঞ্চতরণী: এখানে তিনি পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ—এই পঞ্চতত্ত্ব ত্যাগ করেন।
-
অমরনাথ গুহা: গুহার মুখে পুত্র গণেশ ও ভৈরবকে দ্বাররক্ষী হিসেবে রেখে তিনি একা পার্বতীকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।
পায়রার সেই অমর কাহিনি কথিত আছে, গুহার ভেতরে শিব যখন পার্বতীকে অমরকথা শোনাচ্ছিলেন, তখন দেবী ঘুমের ঘোরে ছিলেন। কিন্তু গুহার এক কোণে লুকিয়ে থাকা দুটি পায়রা সেই কথা পুরোটা শুনে ফেলে এবং অমর হয়ে যায়। আজও বহু ভক্তের বিশ্বাস, গুহার ভেতরে সেই জোড়া পায়রাকে দেখা যায়।
বরফের শিবলিঙ্গের রহস্য বিজ্ঞানীদের মতে, গুহার ছাদ থেকে চুঁইয়ে পড়া জল জমে এই শিবলিঙ্গ তৈরি হয় (stalagmite)। এটি শ্রাবণ মাসে পূর্ণিমার সময় পূর্ণ আকার ধারণ করে এবং অমাবস্যায় গলতে শুরু করে। তবে ভক্তদের কাছে এটি স্বয়ম্ভু শিবের অলৌকিক আশীর্বাদ।
তীর্থযাত্রীদের জন্য পরামর্শ: অমরনাথ যাত্রা কেবল ভ্রমণের বিষয় নয়, এটি ত্যাগের শিক্ষা। শিব নিজে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়দের ত্যাগ করে প্রমাণ করেছেন যে, মৃত্যুকে জয় করতে হলে মোহ ত্যাগ করা আবশ্যক। যাত্রায় যাওয়ার আগে ভক্তদের মনে রাখতে হবে: ১. অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন ও মেডিকেল সার্টিফিকেট সাথে রাখা। ২. পাহাড়ের উচ্চতায় অক্সিজেনের অভাব থাকায় ধীরস্থিরভাবে চলা এবং ‘বম বম ভোলে’ মন্ত্র জপ করা। ৩. গুহার ভেতর মোবাইল বা ক্যামেরা ব্যবহার নিষিদ্ধ, তাই পবিত্রতা বজায় রেখে মন দিয়ে দর্শন করা।
শিবের এই ত্যাগের মহিমা প্রতিটি মানুষের জীবনে মায়া-মোহ কাটিয়ে সত্যের পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগায়।