বুলডোজারের মুখে ৫০০০ VIP ফার্মহাউস! হাই কোর্টের এক আদেশে তোলপাড় দিল্লি-NCR, কাঁপছে রাঘববোয়ালরা!

দিল্লি হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক ও কঠোর নির্দেশ ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে দিল্লি-এনসিআর (Delhi-NCR)-এর ভূমি মাফিয়া, বেআইনি প্রোমোটার এবং প্রভাবশালী মহলের। যমুনা ও হিন্দন নদীর প্লাবনভূমি (Floodplain) থেকে সমস্ত রকম অবৈধ দখল উচ্ছেদের সাফ নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আর এই নির্দেশের পর শুধু দিল্লিই নয়, উত্তর প্রদেশের নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা এবং গাজিয়াবাদেও শুরু হয়ে গেছে কাউন্টডাউন। প্রশাসনের টার্গেটে এখন যমুনার তীরে গড়ে ওঠা ৫,০০০-এরও বেশি ভিআইপি ফার্মহাউস, বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং অবৈধ কলোনি।
গাজিয়াবাদে বিলুপ্তির পথে হিন্দন নদী! ১৪টি গ্রাম প্রশাসনের নজরে
আদালতের চাবুকের পর গাজিয়াবাদ জেলা প্রশাসন যমুনা ও হিন্দন নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণের তালিকা তৈরি করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাঠে নেমেছে। গাজিয়াবাদের প্রায় ১৪টি গ্রামের প্লাবনভূমিতে এমনভাবে স্থায়ী বহুতল ও কলোনি বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যার ফলে হিন্দন নদীর প্রাকৃতিক মানচিত্রটাই বদলে গেছে।
তালিকায় থাকা মূল গ্রামগুলি: কানাওয়ানি, কারহেরা, আর্থালা, ঘুকনা, সিহানি, সাদিকনগর, নুরনগর, মোর্তি, মেওয়ালা আগ্রি, আসলাতপুর, আতাউর, ভানাইদা, নাগলা ফিরোজমোহনপুর এবং শামশের।
লোনি এলাকার দাপট: লোনি এলাকায় যমুনা পুশতার কাছে বদরপুর এবং এলাচিপুরের মতো গ্রামগুলিকে গ্রাস করে অবাধে গজিয়ে উঠেছে অবৈধ কলোনি।
১৫ বছরের পুরোনো কলোনি, ১০ হাজার মানুষের ভরসা শুধুই ‘কাটিয়া’!
আজ প্রায় ১৫ বছর ধরে কানাওয়ানি ডুব কলোনিতে বাস করছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT)-এর কড়া নিষেধাজ্ঞার পর এখানে সমস্ত সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ স্তব্ধ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য রয়েছে মাত্র দুটি ট্রান্সফর্মার। ফলে বাধ্য হয়েই বাসিন্দারা ‘কাটিয়া’ বা অবৈধ হুকিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ, “আসল দোষী তো ভূমি মাফিয়ারা, যারা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে কেটে পড়েছে। প্রশাসন নিরীহ ক্রেতাদের ওপর বুলডোজার না চালিয়ে ওই মাফিয়াদের জেলে ভরুক।”
গ্রেটার নয়ডা: ৫০টি গ্রামে মাফিয়াদের ‘মহা-সিন্ডিকেট’
গ্রেটার নয়ডার সদর ও দাদরি তহসিলের অন্তর্গত ৫০টিরও বেশি গ্রামের নদী তীরবর্তী এলাকা এখন মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য। সব নিয়ম-কানুন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নদীগর্ভে তৈরি হয়েছে হোটেল, হোস্টেল, শপিং কমপ্লেক্স এবং অবৈধ প্লটিং।
সদর তহসিল (২০টি গ্রাম): মোমনাথল (সেক্টর ১৫০), কাসনা, বাদাউলি খাদার, কোন্ডলি বাঙ্গার, মাকানপুর বাঙ্গার, চকবসন্তপুর এবং ওয়াজিদপুর সহ যমুনার তীরের এক বিশাল অংশ এখন বেদখল। অন্যদিকে হিন্দন নদীর তীরে শফিপুর, ঘরবারা, তুঘলাপুর, নামাউলি, রুহেলাপুর, গুর্জারপুর, লাখনাওয়ালি, সুথিয়ানা এবং সুরাজপুরের মতো এলাকায় রমরমিয়ে চলছে বেআইনি নির্মাণ।
দাদরি তহসিল (৩০টিরও বেশি গ্রাম): ছিজরসি, বহলোলপুর, দলেলপুর, সোরখা, গড়ি চৌখান্দি ও কুলেসারা গ্রামে নদীর বুকেই বিছানো হয়েছে অবৈধ প্লটিংয়ের জাল।
নয়ডায় ভিআইপি-দের ৫,০০০ ফার্মহাউস: ফাইল চাপা দেওয়ার নোংরা খেলা!
নয়ডায় যমুনা নদীর সমান্তরালে থাকা সেক্টর ৯৪, ১২৪, ১২৫, ১২৭, ১২৮, ১৩১, ১৩৩, ১৩৪, ১৩৫, ১৬৮ এবং ১৫০ এলাকাগুলি আইনিভাবে “বিজ্ঞাপিত এলাকা” (Notification Area)। এখানে যেকোনো ধরনের স্থায়ী নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
নয়ডা কর্তৃপক্ষের আড়াই বছর আগের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, এই নিষিদ্ধ এলাকাতেই তৈরি হয়েছে ৫,০০০-এর বেশি বিলাসবহুল ও অবৈধ ফার্মহাউস। তৎকালীন সিইও ঋতু মাহেশ্বরীর সময় কিছু উচ্ছেদ অভিযান হলেও, গত দুই বছর ধরে রহস্যজনকভাবে ফাইল বন্ধ ছিল। সূত্রের খবর, প্রায় ১০ বছর আগে এক সমীক্ষায় দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীর নাম সামনে আসতেই পুরো ফাইলটি ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়।
ভিআইপি ফার্মহাউসের আড়ালে রেভ পার্টি ও ড্রাগস সিন্ডিকেট!
গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রে এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে। এই নির্জন বিলাসবহুল ফার্মহাউসগুলি এখন শুধু ছুটি কাটানোর জায়গা নয়, বরং অবৈধ উপার্জনের খনি। প্রতিদিন ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার বিনিময়ে এগুলি বিয়ে, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং উদ্দাম ‘রেভ পার্টি’-র জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। প্লাবনভূমির এই অন্ধকার আস্তানাগুলি এখন হাশিশ, গাঁজা পাচার এবং আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের নিরাপদ করিডোর হয়ে উঠেছে।
বর্ষায় মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা
সেচ দফতরের টেকনিক্যাল টিম স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্ষায় যমুনা ও হিন্দনের জল স্বাভাবিকভাবেই কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসের ভয়াবহ বন্যা তার প্রমাণ। সেবার বন্যার জল মূল বাঁধ পর্যন্ত চলে আসায় এই অবৈধ খামারবাড়ির হাজার হাজার কর্মী ও স্থানীয় গরিব মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এবার আদালতের কড়া মনোভাবের পর, বর্ষার আগেই এই অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে কোমর বাঁধছে যোগী প্রশাসন ও দিল্লি কর্তৃপক্ষ।