মৃত্যুর পর কি মানুষ সবকিছু শুনতে পায়? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য

মানুষের মনে চিরকালই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—মৃত্যুর পর কি সত্যিই সব শেষ? হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি মস্তিষ্ক চিরতরে অন্ধকার হয়ে যায়? দীর্ঘদিনের এই কৌতূহলের উত্তর খুঁজতে আধুনিক বিজ্ঞান একের পর এক চাঞ্চল্যকর গবেষণার তথ্য সামনে এনেছে, যা মৃত্যুর সংজ্ঞাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

মৃত্যুর পর শরীরে কী ঘটে? হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়া মানে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হওয়া। অক্সিজেনের অভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। তবে সব অঙ্গের মৃত্যুর হার সমান নয়। শরীর ও মস্তিষ্কের সবচেয়ে বেশি শক্তি ও অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, তাই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হলে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কের ওপরই।

কতক্ষণ সচল থাকে মস্তিষ্ক? বিজ্ঞানীদের মতে, হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষ জ্ঞান হারায়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, মস্তিষ্কের কিছু কোষ মুহূর্তের মধ্যেই মারা যায় না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হওয়ার পরেও প্রায় ২ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন সেল বা মস্তিষ্কের কোষে মৃদু বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ (Electrical activity) চলতে থাকে। যদিও এই সময়কালে ওই ব্যক্তির পক্ষে কোনো কিছু বোঝা বা প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব নয়।

স্মৃতি কি তবে সিনেমার মতো ভেসে ওঠে? ২০২২ সালের একটি গবেষণা বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগে কিছু মানুষের মস্তিষ্কে এমন বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ধরা পড়েছে, যা সাধারণত গভীর স্মৃতিচারণ বা স্বপ্ন দেখার সময় তৈরি হয়। এর থেকেই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তটিতে হয়তো মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো সিনেমার পর্দার মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

মৃত কি শুনতে পান? মৃত্যুর ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতে শ্রবণশক্তি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত হয়তো মানুষ চারপাশে আওয়াজ কিছুটা অনুভব করতে পারে। তাই কোমা বা মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের পাশে আপনজনদের কথা বলার পরামর্শ দেন অনেক চিকিৎসক।

বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা ও সীমাবদ্ধতা: সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরও মস্তিষ্কের কোষকে আংশিকভাবে সক্রিয় করতে সফল হয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এটি কোনোভাবেই মানুষকে পুনরায় জীবিত করার প্রক্রিয়া নয়; এটি কেবল কোষীয় পর্যায়ের পরীক্ষা। চেতনা ফিরিয়ে আনার কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি।

বিজ্ঞানের মতে, মৃত্যুর সাথে সাথে মস্তিষ্ক এক লহমায় পুরোপুরি বন্ধ হয় না, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার ব্যাপ্তি নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর সময়ের শারীরিক অবস্থার ওপর। মৃত্যুর ওপারের এই রহস্য নিয়ে নিরন্তর গবেষণাই হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের আরও বড় কোনো সত্যের সন্ধান দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *