সংসারের কাজের দাম মাসে ৩০ হাজার টাকা! গৃহবধূদের নিয়ে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

সংসার সামলানো যে কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়, বরং তা দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনের এক বড় অংশ—এই বার্তা দিয়েই এক যুগান্তকারী রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট করে দিল, বছরের পর বছর ধরে গৃহবধূরা যে শ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। এখন থেকে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে গৃহবধূর মাসিক পরিষেবার মূল্য ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।
কী ছিল সেই মামলা?
২০০১ সালের এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক গৃহবধূর পরিবারের দায়ের করা একটি পুরনো মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ সামনে আসে। শুরুতে মোটর দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ট্রাইবুনাল ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিল, যা পরে হাইকোর্ট ৮ লক্ষ ৪০ হাজারে উন্নীত করে। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ সেই ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়িয়ে ৬২ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকায় উন্নীত করে বিমা সংস্থাকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বিচারপতির ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ:
বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ গৃহবধূদের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রগতিশীল মন্তব্য করেছেন:
‘দেশের নির্মাতা’: আদালত স্পষ্ট বলেছে, ‘গৃহবধূ’ শব্দটি তাঁদের অবদানের গভীরতাকে বোঝাতে যথেষ্ট নয়। বরং তাঁরা প্রকৃত অর্থেই ‘দেশের নির্মাতা’, কারণ তাঁদের ত্যাগের ওপরই সমাজের ভিত দাঁড়িয়ে থাকে।
পরিশ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য: সন্তান প্রতিপালন থেকে গৃহস্থালির প্রতিটি কাজ—সবই অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান। তাই এই শ্রমকে শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে বিচার না করে মাসিক অন্তত ৩০ হাজার টাকার পারিশ্রমিক হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।
বিয়ের সমীকরণ: আদালত আরও বলেছে, বিবাহ মানেই কাউকে পরিচারিকা হিসেবে নিয়োগ করা নয়। সংসারের দায়ভার স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই সমান।
ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা: বিয়ের পরেও একজন মহিলার ক্যারিয়ার বা পেশাগত স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া নিষ্ঠুরতা নয়, বরং এটি তাঁর স্বাভাবিক অধিকার। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির চাপে এই অধিকার খর্ব করা অনুচিত।
সামাজিক স্বীকৃতি ও অধিকার:
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ দেশের কোটি কোটি গৃহবধূর অদৃশ্য শ্রমকে এক নতুন আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি দিল। আদালত জানিয়েছে, ঘরের কাজে নিয়োজিত এই বিপুল সংখ্যক নারীর অবদানের স্বীকৃতি কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, পারিবারিক সম্পত্তির অধিকারেও তাঁদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে এখন গুরুত্ব সহকারে ভাবার সময় এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ মামলায় গৃহবধূদের অবদানের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে নতুন পথ তৈরি হলো, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচার ব্যবস্থায় এক বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে।