“ভাই, আমরা আর বাঁচব না!” দিল্লির হোটেলে জীবন্ত দগ্ধ একই পরিবারের ৮ সদস্য, বিবেকের শেষ ফোন কলে কাঁপছে দেশ!

“ভাই, হয়তো আমরা আর বাঁচতে পারব না। চারিদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে…।”— দিল্লির মালভিয়া নগরের ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলের তিনতলার একটি বন্ধ ঘরে আটকে থেকে গুরুগ্রামের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) বিবেক আগরওয়ালের ফোনে বলা শেষ কথা ছিল এটিই। এই আকুল আর্তনাদের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিবেক, তাঁর স্ত্রী, মা এবং দুই নিষ্পাপ কন্যাসন্তানসহ একই পরিবারের ৮ জনের জীবন ওই হোটেলের বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখায় চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। বুধবার সকালে ঘটা এই নজিরবিহীন অগ্নিকাণ্ডে ১১ জন বিদেশী নাগরিকসহ মোট ২১ জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
বাবার চিকিৎসা করাতে এসে সপরিবারে শেষ বিদায়
গুরুগ্রামের সেক্টর ৪৬-এর বাসিন্দা সিএ বিবেক আগরওয়াল তাঁর অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য সপরিবারে দিল্লিতে এসেছিলেন। তাঁর বাবা সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাবার দেখভালের সুবিধার্থেই বিবেক তাঁর স্ত্রী তরজানি, মা প্রেমলতা, দুই একরত্তি মেয়ে জীবিতা ও ভারিয়া, আত্মীয় ঝাভেরি এবং কাকা অশোক গোয়েল ও কাকিমা কমলাকে নিয়ে হাসপাতালের কাছের এই হোটেলেই উঠেছিলেন। বুধবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ যখন আগুন লাগে, তখন পুরো পরিবার ঘরের ভেতরেই ঘুমন্ত বা অসতর্ক অবস্থায় ছিল। ধোঁয়ার গ্রাসে চলে যাওয়ার মুহূর্তে বিবেক শেষ চেষ্টা হিসেবে তাঁর ভাইকে ফোন করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠল হোটেলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি!
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আগুন লাগার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো পাঁচতলা ভবনটি দাউদাউ করে জ্বলে উঠে একটি জ্বলন্ত চিমনিতে পরিণত হয়। আগুন লাগার সাথে সাথেই ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই বিপর্যয় ডেকে আনে হোটেলের ডিজিটাল প্রযুক্তি। বিদ্যুৎ না থাকায় হোটেলের সেন্সর-ভিত্তিক প্রধান ফটকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্যাম বা লক হয়ে যায়। ফলে ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের বেরোনোর একমাত্র পথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ঘরের জানালাগুলো এয়ার-টাইট থাকায় বাতাস চলাচলের কোনো পথ ছিল না। সাকেত হাসপাতালের বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনেরা জানান, মৃতদেহগুলো এতটাই ঝলসে গেছে যে চেনার কোনো উপায় নেই। এখন ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে দেহগুলি শনাক্ত করা হবে।
৬টি ঘরের লাইসেন্সে তৈরি ২৫টি রুম! মালিকের চরম ঔদ্ধত্য
এই নারকীয় দুর্ঘটনা হোটেল প্রশাসনের সীমাহীন লোভ এবং অপরাধমূলক অবহেলাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনটিতে মাত্র ৬টি ঘর তৈরির আইনি অনুমতি ছিল। কিন্তু পুরসভার আধিকারিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মালিক লাভকেশ বাজাজ অবৈধভাবে ৫টি তলা জুড়ে ২৫টিরও বেশি ঘর তৈরি করেছিলেন। হোটেলটির কোনো ফায়ার এনওসি (NOC) বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছিল না। এমনকি হোটেলের স্মোক ডিটেক্টর বা ফায়ার অ্যালার্মগুলোর একটিও কাজ করেনি। এর ওপর নিচতলায় বেআইনিভাবে মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার আগুনকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে।
পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত হোটেল মালিক লাভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করে অনিচ্ছাকৃত নরহত্যার মামলা দায়ের করেছে। তবে গ্রেপ্তারের পর লাভকেশের অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন বয়ান পুলিশকেও চমকে দিয়েছে। সে ঔদ্ধত্যের সাথে বলে, “আমি নিজে তো আর ঘর বাড়াইনি। দিল্লিতে এই সমস্ত ছোটখাটো পরিবর্তন স্বাভাবিক; এখানে এগুলো খুবই সাধারণ ব্যাপার।”
দেবদূতের মতো পাশে দাঁড়ালেন স্থানীয় মুসলিম যুবকেরা, বাঁচল ৫৮টি প্রাণ
এই চরম অন্ধকারের মধ্যেও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। হোটেলের ঠিক সামনেই তোশক ও কম্বলের দোকান চালান আরমান নামের এক ব্যক্তি। আগুন লাগা মাত্রই তিনি নিজের ব্যবসার কথা না ভেবে দোকানের সমস্ত নতুন তোশক ও লেপ রাস্তায় বিছিয়ে দেন। জীবন বাঁচাতে ওপরের তলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া বহু মানুষ এই তোশকের ওপর পড়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান।
পাশাপাশি স্থানীয় যুবক আফজল, শাহরুখ, আনিস, আমির ও ওয়াসিম নিজেদের জীবন বাজি রেখে জানালার গ্রিল ভেঙে এবং কৃত্রিম শ্বাস (CPR) দিয়ে প্রায় ৫৮ জনকে জ্বলন্ত নরক থেকে জীবিত উদ্ধার করেন। এই উদ্ধারকাজে ১০ জন পুলিশ কর্মীও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে ১৫ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউ-তে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন।