‘মোদীজি বলেছিলেন মেহনত কিজিয়ে, জিতকে আইয়ে!’ দিনে ২২ ঘণ্টা কাজ করে কীভাবে জিতলেন পাপিয়া অধিকারী?

টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। রূপোলি পর্দা থেকে রাজনীতির ময়দান— সব জায়গাতেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি ও ক্যারিশমা বরাবরই নজর কেড়েছে। টালিগঞ্জের হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে ঐতিহাসিক জয়ের পর নিজের রাজনৈতিক সফর ও প্রচারকৌশল নিয়ে আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মন খুললেন তিনি।
মোদী-শুভেন্দুর সেই মন্ত্রেই বাজিমাত!
নিজের এই জয়ের নেপথ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের থেকে পাওয়া বিপুল অনুপ্রেরণাকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন পাপিয়া অধিকারী। তিনি বলেন:
“ভারতীয় জনতা পার্টির শ্রদ্ধেয় নরেন্দ্র মোদী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। মোদীজি আমাকে স্পষ্ট বলেছিলেন— ‘মেহনত কিজিয়ে, জিতকে আইয়ে’ (পরিশ্রম করুন, জিতে আসুন)। ওঁর এই একটা কথাই আমার মনের জোর বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।”
শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ভরসাও তাঁর অন্যতম হাতিয়ার ছিল। পাপিয়া জানান, “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় শুভেন্দু অধিকারী আমাকে বারবার সাহস জুগিয়েছেন। অন্যেরা যখন এই আসনটিকে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং বলছিল, শুভেন্দুবাবু তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন— ‘আপনিই জিতবেন, দেখে নেবেন আপনি জিতবেন’।”
এর পাশাপাশি দলের রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যও তাঁকে “আরেকটু পুশ করো, আরেকটু চেষ্টা করলেই হবে” বলে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন।
বিপ্লব দেবের দাপট ও দিনে ২২ ঘণ্টার পরিশ্রম
ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা বিপ্লব দেবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা গেল টালিগঞ্জের নতুন বিধায়ককে। পাপিয়া বলেন, “বিপ্লব দেবের মতো একজন দাপুটে নেতা, অথচ এত ভালো মানুষ ভাবা যায় না! তিনি ভোটের আগেই আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি তো জিতেই গেছেন’। চারদিক থেকে এত অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম যে, আমি দিনে প্রায় ২২ ঘণ্টা করে কাজ করতে শুরু করেছিলাম।”
নিজের জয়ের আবহকে সিনেমার ‘হাউসফুল’ বোর্ডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি হাসিমুখে যোগ করেন, “বাইরে থেকে দলের যাঁরা পর্যবেক্ষক এসেছিলেন, তাঁরাও বলছিলেন আপনার জয় নিশ্চিত। আমার তখন মনে হচ্ছিল সিনেমা রিলিজ করার আগেই যেন শো ‘হাউসফুল’! তাহলে তো সেই ছবির জন্য মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করতেই হবে। তাই আমি জান লড়িয়ে খেটেছি, নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি।”
অরূপ বিশ্বাসের গড় ভাঙার নেপথ্য কৌশল: ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’
টালিগঞ্জের দীর্ঘদিনের তৃণমূল হেভিওয়েট অরূপ বিশ্বাসের দুর্গ কীভাবে ভাঙলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে পাপিয়া অধিকারী তাঁর রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি খোলসা করেন। তিনি বলেন, “তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাস বুক ঠুকে বলেছিলেন, কোনো কোনো এলাকায় নাকি তাঁকে কেউ হারাতে পারবে না। আমি সেই সমস্ত এলাকাগুলো নিয়ে রাত জেগে কাটাছেঁড়া ও বিশ্লেষণ করেছি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম ওইসব জায়গায় কারা থাকেন এবং কেন সেখানে অন্য কেউ জিততে পারবে না?”
পাপিয়ার পর্যবেক্ষণ: “বিশ্লেষণ করে দেখলাম, সেই সব এলাকাগুলো আসলে চরম অনুন্নত। শাসকদল সেখানকার সাধারণ মানুষকে স্রেফ ভয় দেখিয়ে কব্জায় রেখেছিল। আমি সেখানে গিয়ে মানুষকে শুধু একটা স্লোগানই দিয়েছিলাম— ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’।”
ব্যতিক্রমী প্রচারেই মানুষের মন জয়
অন্যান্য রাজনীতিকদের মতো চিরাচরিত ধারায় ভোট চাননি এই তারকা বিধায়ক। তিনি জানান, তাঁর প্রচারকৌশল ছিল একেবারেই আলাদা। “আমি আমার নির্বাচনী প্রচারে সাধারণ মানুষকে ‘এইটা করব, ওইটা করব’ বলে গালভরা প্রতিশ্রুতি দিইনি। বরং তাঁদের দাওয়ায় বসে গল্প করেছি। মানুষ যাতে আমাকে নিজেদের কাছের লোক ভাবতে পারেন, সেই চেষ্টা করেছি। আর সাধারণ মানুষও ভেবেছেন— আরে, এতো আমাদের ঘরের কথাই বলছে!”
ভোট মিটেছে, টালিগঞ্জের মানুষ ঘরের মেয়েকে জিতিয়ে বিধানসভায় পাঠিয়েছেন। এবার মানুষের পাশে থাকার পালা। সাক্ষাৎকারের শেষে টালিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “মানুষ আমাকে জিতিয়েছেন। এবার দলমত নির্বিশেষে টালিগঞ্জের প্রতিটি মানুষের উন্নয়নে এবং তাঁদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে কাজ করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।”