২১শের ভোট পরবর্তী হিংসায় নতুন করে FIR-তদন্ত, জেনেনিন কী অ্যাকশন নিচ্ছে সরকার?

বাংলার মসনদ পরিবর্তনের পর এবার কি তবে পুরোনো হিসেবনিকেশ চুকিয়ে ফেলার পালা শুরু হলো? মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক কড়া পদক্ষেপ করছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর এবার সরাসরি হাত দিলেন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়ে—২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসা। ক্ষমতায় এসেই পুরোনো সেই সব হামলার ঘটনায় নতুন করে কোমর বেঁধে তদন্তে নামল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে শতাধিক মামলার তদন্ত, দায়ের হয়েছে নতুন এফআইআর (FIR), এমনকি বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরোনো ফাইলও নতুন করে খুলতে শুরু করেছে পুলিশ।
বিজেপি সূত্রের খবর, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসা নিয়ে এবার আর কোনো আপস করতে রাজি নয় নতুন সরকার। নবান্নের সবুজ সংকেত মেলার পরেই রাজ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে কড়া নির্দেশ। আর তার পরেই অভূতপূর্ব তৎপরতা দেখা গেছে পুলিশ মহলে। জানা গেছে, এ পর্যন্ত মোট ৪৫৮টি ঘটনার ক্ষেত্রে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ নতুনভাবে এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে ১৮১টি মামলায়। পাশাপাশি, বিগত সরকারের আমলে প্রমাণের অভাবে বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৫৯টি কেস পুনরায় খোলা হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, তৎকালীন বিরোধী দল অর্থাৎ বিজেপি এবং অন্যান্য বিরোধীদের যেসব কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, এবার তাঁরা প্রত্যেকেই ন্যায়বিচার পাবেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোট-পরবর্তী হিংসা বা রাজনৈতিক মারামারি কোনো নতুন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের পরেই বাংলায় রক্তপাতের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের কর্মী খুন, বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, ভাঙচুর, মারধর থেকে শুরু করে বিরোধী কর্মীদের বিরুদ্ধে ভুয়ো পুলিশি মামলা দেওয়ার মতো ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠেছে বিগত বছরগুলোতে। ঘরছাড়া হতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে।
বিজেপির দাবি, ২০২১ সালের নির্বাচনের পর তাঁদের কর্মীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। গেরুয়া শিবিরের দাবি অনুযায়ী, সেবার ভোটের পর প্রায় ৩০০-র বেশি বিজেপি কর্মী খুন হয়েছিলেন। হাজার হাজার সমর্থকের বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। প্রাণভয়ে ঘরছাড়া ছিলেন প্রচুর কর্মী। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই নিয়ে বারবার সরব হয়েছিলেন এবং হুঙ্কার দিয়ে রেখেছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে এই সবের বিচার হবে। এবার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পরই নিজের সেই কথা রাখলেন তিনি। শুরু হলো মেগা অ্যাকশন।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পালাবদলের পর এবার পাল্টা কর্মীদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে বলে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি নবনির্বাচিত বিধানসভার স্পিকারের শপথ গ্রহণের দিন এই প্রসঙ্গটি তোলেন বর্তমান বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, ভোট-পরবর্তী সময়ে এখন অনেক তৃণমূল কর্মীকে মারধর করা হচ্ছে এবং তাঁরা ঘরছাড়া। তাঁদের ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করুক নতুন সরকার।
তৃণমূলের এই অভিযোগ অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শোভনদেবের এই দাবির জবাবে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এবার ভোট-পরবর্তী হিংসা বাংলায় প্রায় হয়নি বললেই চলে। বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা এই ধরণের হিংসাত্মক কাজ করে না।
সব মিলিয়ে, পুরোনো হিংসার ফাইল খোলার এই সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে বাংলার রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে। রাজনৈতিক মহলের মতে, পুরোনো মামলাগুলো যেভাবে নতুন করে গতি পাচ্ছে, তাতে আগামী দিনে তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।