গঠনের ২৪ ঘণ্টাতেই পুলিশের মহাজাগতিক অ্যাকশন! শিলিগুড়িতে লরি আটকে উদ্ধার কোটি টাকার মাদক, গ্রেফতার ৩

মাদক কারবারিদের কোমর ভেঙে দিতে শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের নতুন চাল যে মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা চব্বিশ ঘণ্টাতেই প্রমাণিত হলো। শহরকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজার তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল বিশেষ ‘অ্যান্টি নার্কোটিক্স টাস্কফোর্স’ (ANTF)। আর এই টাস্কফোর্স ময়দানে নামার ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মিলল বিরাট সাফল্য। বৃহস্পতিবার রাতে মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানা এলাকায় পৃথক দুটি সফল অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করল পুলিশ। হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে দুই লরি চালকসহ তিনজনকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের গুয়াহাটি থেকে একটি বড় মালবাহী ট্রাকে করে বিপুল পরিমাণ মাদক দিল্লিতে পাচারের এক গোপন ছক কষেছিল আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা। কিন্তু সেই খবর পৌঁছে যায় বাগডোগরা থানার সাদা পোশাকের পুলিশের কাছে। খবর পাওয়া মাত্রই সিংঝোরা মোড় এলাকায় ওত পেতে বসে থাকে পুলিশ বাহিনী। সেখানে উত্তরপ্রদেশের নম্বরের (UP-76AT-3439) একটি লরিকে আটকে তল্লাশি চালাতেই চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। লরির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় ১৭টি বড় প্যাকেট, যার মধ্যে ঠাসা ছিল মোট ৫১০ কেজি পপি সিডস বা পোস্ত দানা, যা মূলত আফিম তৈরির প্রধান কাঁচামাল।
ট্রাকে তল্লাশি ও ব্রাউন সুগার উদ্ধার: গ্রেফতার ৩
উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ পোস্ত দানার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। এই বিপুল পরিমাণ সামগ্রী পরিবহণের কোনও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ট্রাকের চালক গৌরব কুমার যাদব (২২) এবং খালাসি সুমনুউদ্দিন লস্করকে (৩৬) পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করে। ধৃতদের মধ্যে গৌরব উত্তরপ্রদেশের এবং সুমনুউদ্দিন অসমের বাসিন্দা। আন্তঃরাজ্য এই মাদক চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
অন্যদিকে, একই রাতে মাটিগাড়া থানার পুলিশও পাঁচকেলগুড়ি এলাকায় অন্য একটি ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখানে ৫৪ গ্রাম ব্রাউন সুগারসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে গৌরাঙ্গ বর্মন নামে এক স্থানীয় মাদক কারবারি। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, ওই এলাকায় কাউকে মাদকের ডেলিভারি দিতেই এসেছিল গৌরাঙ্গ। ধৃত তিনজনের বিরুদ্ধেই এনডিপিএস (NDPS) আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করছে এই নতুন টাস্কফোর্স?
এই বড় সাফল্যের পর শিলিগুড়ি কমিশনারেটের ডিসিপি কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, “এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় একটি সাফল্য। নবগঠিত এই টাস্কফোর্স শুধুমাত্র মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্যই বিশেষ নজরদারি চালাবে। কাজ শুরুর প্রথম দিন থেকেই এর সুফল মিলতে শুরু করেছে। আমরা শহর থেকে মাদকের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর।”
উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের (DD) সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে এই বিশেষ স্কোয়াড। এই দলে একজন অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার এবং একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার অফিসার ও পুলিশ কর্মী রয়েছেন। এছাড়া কমিশনারেটের অধীনে থাকা প্রতিটি থানার দুজন করে পুলিশ আধিকারিককে ‘নোডাল অফিসার’ করা হয়েছে। কোনও এলাকা থেকে মাদক পাচারের খবর আসামাত্রই যাতে স্থানীয় থানার ওই দুই আধিকারিক দ্রুত টিম নিয়ে মুভ করতে পারেন, সেই কারণেই এই বিকেন্দ্রীকরণ। শহরের প্রতিটি প্রবেশ পথ এবং সন্দেহভাজন এলাকায় নাকা চেকিং এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ সাংসদ রাজু বিস্তার
শিলিগুড়ি পুলিশের এই ঝোড়ো ইনিংংসকে সাধুবাদ জানালেও, মাদক প্রবেশের মূল উৎস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা। শিলিগুড়ির ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “শিলিগুড়ি হলো দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ করিডোর। এখানে আন্তর্জাতিক এবং আন্তঃরাজ্য সীমান্ত থাকায় মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি সবসময়ই বেশি।”