কাশ্মীরে এবার বড় ধামাকা! রাস্তায় নেমে “মদ বন্ধের” হুঙ্কার বিজেপির, উপত্যকায় কি তবে জারি হচ্ছে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা?

গ্রীষ্মের মরশুমে আচমকাই উত্তপ্ত হয়ে উঠল ভূস্বর্গের রাজনৈতিক বাতাস। কাশ্মীর উপত্যকায় মদের দোকান খোলা রাখার বিরুদ্ধে এবার সরাসরি রাস্তায় নেমে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) কর্মী ও সমর্থকরা। তাঁদের স্পষ্ট এবং একদফা দাবি—সমগ্র কাশ্মীর বিভাগে মদ বিক্রি ও ক্রয়ের ওপর অবিলম্বে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।
আজ, ১৫ মে ২০২৬ শুক্রবার শ্রীনগরের রাস্তায় বিজেপির এই প্রতিবাদ মিছিলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। মিছিলকারীরা “কাশ্মীরে শরাববন্দি চাই” স্লোগান দিতে দিতে শহরের মূল রাস্তাগুলি প্রদক্ষিণ করেন। আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল একাধিক পোস্টার ও ব্যানার, যেখানে লেখা ছিল—‘আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করুন’ এবং ‘যুবসমাজকে বাঁচান’।
যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে! সরব বিজেপি নেতৃত্ব
প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, কাশ্মীরের একটি নিজস্ব বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ রয়েছে। সেখানে এভাবে মদের দোকান খোলা রাখার ফলে স্থানীয় যুবসমাজ চরম ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া বিজেপি নেতা রাহুল শর্মা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “কাশ্মীর উপত্যকা হলো শান্তি, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির পুণ্যভূমি। এখানে মদের মতো মাদক এভাবে সহজলভ্য করে দিলে আমাদের ছেলেমেয়েরা নেশার অন্ধকারে ডুবে যাবে। উপত্যকায় এমনিতেই বেকারত্ব ও হতাশা রয়েছে, তার ওপর যদি মদের নেশা যোগ হয় তবে হাজার হাজার পরিবার নিমেষের মধ্যে ভেঙে যাবে। আমরা প্রশাসনের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি, পুরো কাশ্মীর ডিভিশনে মদের ব্যবসা অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।”
স্থানীয় মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: রুটি-রুজির সংকট বনাম পারিবারিক শান্তি
বিজেপির এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মহিলাদের সমর্থন: এলাকার বহু অভিভাবক এবং মহিলা সংগঠন এই প্রতিবাদকে দু’হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, মদের কারণে ঘরে ঘরে অশান্তি বাড়ছে। বাড়ির পুরুষরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের চিন্তা: অন্যদিকে, চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন মদের দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী জানান, “আমরা সরকারের কাছ থেকে আইনি লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা করছি। হঠাৎ এভাবে সবকিছু বন্ধ করে দিলে আমাদের পরিবারের রুটি-রুজি সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাবে।”
পর্যটন শিল্পে প্রভাব: কাশ্মীরের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাংশের মতে, উপত্যকায় সম্পূর্ণ মদ নিষিদ্ধ করা হলে বিদেশি ও ভিনরাজ্যের পর্যটকদের সংখ্যায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে বিজেপি কর্মীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, কাশ্মীরের সৌন্দর্য ও শান্তি কোনো মদের দোকানের ওপর নির্ভর করে না।
২০১৯-এর পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরের প্রশাসনিক ও সামাজিক চিত্রে বহু পরিবর্তন এসেছে। জম্মু-কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর প্রশাসন নতুন করে কিছু মদের দোকানের লাইসেন্স অনুমোদন করেছিল। শুরু থেকেই স্থানীয় ধর্মীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি এর বিরোধিতা করে আসছিল। তবে এবার এই ইস্যুটিকে পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে আন্দোলনে ধার বাড়াল বিজেপি।
দলের জেলা নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রতিবাদ শুধুমাত্র শ্রীনগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী দিনে বারামুলা, অনন্তনাগ (আনন্দনগর), কুলগামসহ কাশ্মীরের প্রতিটি জেলাতেই এই একই ধরনের জোরদার কর্মসূচি নেওয়া হবে।
রাজভবনে স্মারকলিপি, সতর্ক পুলিশ
আজকের এই হাই-ভোল্টেজ মিছিলকে কেন্দ্র করে শ্রীনগরের রাস্তায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। তবে স্বস্তির বিষয়, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এই বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও, বিশেষ সূত্রে খবর—মুখ্যমন্ত্রী দফতর এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরের (LG) দফতরে বিজেপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। তাঁদের দাবি, কাশ্মীর উপত্যকায় মদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে জম্মু অংশের মতো কঠোর আবগারি ব্যবস্থা চালু করা হোক। উপত্যকার এক তরুণের কথায়, “আমরা খেলাধুলো, শিক্ষা আর কর্মসংস্থান চাই, নেশা নয়।” এখন দেখার, বিজেপির এই ‘শরাববন্দি’ আন্দোলনের চাপে পড়ে প্রশাসন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয় কি না।