‘ঘরের মেয়ে’ মমতাকে ঘরেই হারালেন শুভেন্দু, কী কী কারণে পরাজয় ভবানীপুরে?

২০২১-এ মেজোবোন ‘নন্দীগ্রাম’ ফিরিয়ে দিয়েছিল। ২০২৬-এ বড়বোন ‘ভবানীপুর’ও কি শেষমেশ বিট্রে করল? নিজের খাসতালুক, নিজের পাড়া, এমনকি নিজের বুথেও শুভেন্দু অধিকারীর দাপটে ধূলিসাৎ হয়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় ভাবমূর্তি। সোমবার ভবানীপুরের গণনাকেন্দ্র যখন টানটান উত্তেজনায় ফুটছে, ঠিক তখনই ঘটল সেই অঘটন। ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে নিজের গড়ে পরাস্ত হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

রাজনীতিতে একেই বোধহয় বলে সময়ের পরিহাস। যুব কংগ্রেসের দিনগুলো থেকে যে কালীঘাট-ভবানীপুর মমতার রাজনৈতিক উত্থানের সাক্ষী, সেই মাটিই আজ তাঁর পায়ের তলা থেকে সরে গেল। নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুর—শুভেন্দু অধিকারী যেন মমতার কাছে এক অপ্রতিরোধ্য ‘জায়ান্ট কিলার’ হয়ে উঠলেন।

নাটকীয় মোড় ও সন্ধ্যার সেই ধস

সোমবার সকাল থেকেই ভবানীপুরে ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পোস্টাল ব্যালটে শুভেন্দু এগিয়ে থাকলেও সপ্তম রাউন্ডের পর ঝড়ের গতিতে লিড নিতে শুরু করেন মমতা। এক সময় ১৯ হাজার ভোটে এগিয়ে গিয়ে জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর থেকেই খেলা ঘুরতে শুরু করে। ১৮ রাউন্ডের শেষে দেখা যায়, মমতার দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেন শুভেন্দু অধিকারী।

কেন হারল তৃণমূল? নেপথ্যে তিন বড় কারণ

১. আরজি কর ও নারী সুরক্ষা ইস্যু: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরজি করের নৃশংস ঘটনা নারী সুরক্ষা নিয়ে মমতার যে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ছিল, তাতে বড় আঘাত হেনেছে। ভবানীপুরের মতো শিক্ষিত ও সচেতন ভোটার মহল এই ইস্যুটিকে সহজভাবে নেয়নি, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ব্যালট বক্সে।

২. ‘মিনি ইন্ডিয়া’র বদলে যাওয়া সমীকরণ: ভবানীপুর মানেই হরেক ভাষা ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। এবার শুধু গুজরাটি বা মারওয়াড়ি ভোটাররাই নন, বাঙালি হিন্দুদের একটি বড় অংশ এবং বহুতল আবাসনগুলোর বাসিন্দারাও ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালির তৃণমূলের প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভই শুভেন্দুর জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

৩. ভোটার তালিকায় ‘SIR’ আতঙ্ক: নির্বাচনের আগে ভোটার স্ক্রুটিনি বা SIR প্রক্রিয়ায় ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৭ থেকে ৫১ হাজার নাম বাদ পড়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়া হারের অন্যতম বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছে তৃণমূল শিবির।

বিজেপির সুক্ষ্ম ‘চক্রব্যুহ’

ভবানীপুরকে এবার নিছক আসন হিসেবে দেখেনি বিজেপি। মাসের পর মাস ধরে এলাকার ডেমোগ্রাফি নিয়ে অঙ্ক কষেছে গেরুয়া শিবির। অতীতে এই কেন্দ্রে সেভাবে শক্তিশালী প্রার্থী না দিলেও, এবার শুভেন্দুকে নামিয়ে প্রেস্টিজ ফাইটে নামে তারা। বুথ স্তরের পাটিগণিত এবং মমতার বিরুদ্ধে কড়া মেরুকরণের কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারের মাঝপথে একবার মমতা মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে বলেছিলেন, “এরা আমায় মিটিং পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। পারলে ভোটটা দেবেন।” আজ পরাজয়ের পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, সেই মন্তব্য কি আসলে কোনো অশনি সংকেতের পূর্বাভাস ছিল? নাকি স্রেফ শেষ মুহূর্তের ভিক্টিম কার্ড? উত্তর যাই হোক, ভবানীপুরের এই হার বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করল।