পিপাসায় ছটফটানি, পেটে যাচ্ছে বিষ! গাইঘাটায় গঙ্গার জলের বদলে কল দিয়ে বেরোচ্ছে ‘মৃত্যু’, ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রাম!

“ভোটের সময় কত লোক আসে, বাবু-মামা বলে কত প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়। আর ভোট মিটলেই সব হাওয়া! আমাদের চেনার লোক থাকে না।” উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার বিষ্ণুপুর মাঠপাড়ার বাসিন্দা ভীম দাসের এই আক্ষেপ আসলে এক জ্বলন্ত দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত। শুধু তিনি নন, গোটা গ্রামের শরীরে এখন আর্সেনিকের বিষাক্ত ছোপ। কল থাকলেও জল নেই, আর যা আছে তা পানের অযোগ্য।

বিপজ্জনক মাত্রায় বিষ: সমীক্ষায় চাঞ্চল্য আর্সেনিক প্রতিরক্ষা কমিটির দেওয়া তথ্য মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। গাইঘাটার ভূগর্ভস্থ জলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৮৮ গুণ বেশি আর্সেনিক রয়েছে। এই ব্লকের প্রায় এক হাজার মানুষ এখন আর্সেনিক আক্রান্ত। অথচ অভিযোগ, গত দেড় বছর ধরে গ্রামে কল ও পাইপলাইন বসানো থাকলেও এক ফোঁটা গঙ্গার জল পৌঁছায়নি কারও বাড়িতে।

জল যখন কেনা পণ্য যাদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা ২০ থেকে ২৫ টাকা দিয়ে ২০ লিটার পানীয় জল কিনে খাচ্ছেন। কিন্তু যাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাঁদের ভরসা সেই টিউবওয়েলের ‘বিষ-জল’। এলাকার বাসিন্দা শ্রাবণী দাসের কথায়, “টাকা দিয়ে কল বসালাম, অথচ জল পাই না। মাঝেমধ্যে টিউবওয়েল খারাপ হলে নিজেদের চাঁদা তুলে সারাতে হয়। আমরা কি শুধুই ভোট দেওয়ার মেশিন?”

রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি নির্বাচনী উত্তাপে এই জলের সমস্যাই এখন প্রধান হাতিয়ার। বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের দাবি, মোদী সরকারের স্বপ্নের প্রকল্পকে বাংলায় বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না মমতা সরকার। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ৬ মাসের মধ্যে জল মিলবে। অন্যদিকে, তৃণমূল প্রার্থী নরোত্তম বিশ্বাসের পাল্টা দাবি, পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে, দ্রুত জল পৌঁছে যাবে মানুষের দুয়ারে।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কাজলকৃষ্ণ বণিকের মতে, আর্সেনিকোসিসের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। পরিশ্রুত পানীয় জলই এর একমাত্র প্রতিকার। অথচ অপরিকল্পিত নগরায়ন ও প্রশাসনিক গাফিলতিতে এখনও ভূগর্ভস্থ জলই পান করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিষাক্ত এই জল শরীরে বৃষ্টির দাগের মতো ছোপ তৈরি করে, যা পরে হাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

উপসংহার ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইছে গাইঘাটায়। কিন্তু মাঠপাড়ার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, এই প্রতিশ্রুতি কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে, নাকি আগামী পাঁচ বছরও তাঁদের ২০ টাকায় এক জার জল কিনেই জীবন কাটাতে হবে? উত্তর দেবে সময়।