পহেলগাম গণহত্যা: এক বছর পর ফিরে দেখা সেই অভিশপ্ত ২২শে এপ্রিল, যেখানে ২৬ প্রাণ কেড়েছিল সন্ত্রাসীরা!

২০২৫ সালের ২২শে এপ্রিল। বাইসারান উপত্যকায় পর্যটকদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গিদের বুলেটের শব্দে স্তব্ধ হয়ে যায় পাহাড়ের গান। জঙ্গিরা বেছে বেছে অমুসলিম পর্যটকদের ওপর হামলা চালায়। যাদের মধ্যে ছিলেন মধ্যবিত্ত বাবা, নববিবাহিত সেনাসদস্য, এমনকি বিদেশের মাটিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারও।

সেই ২৬ জন শহীদের তালিকা ও সংক্ষিপ্ত স্মৃতি:
১. সুশীল নাথানিয়েল (৫৮, ইন্দোর): খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সুশীল কালিমা পড়তে অস্বীকার করায় তাঁকে পরিবারের সামনেই গুলি করা হয়।

২. সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ (স্থানীয় মুসলিম): পর্যটকদের বাঁচাতে জঙ্গিদের রাইফেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ বহু জীবন বাঁচিয়েছে।

৩. বিনয় নারওয়াল (২৬, হরিয়ানা): নৌবাহিনীর এই লেফটেন্যান্ট বিয়ের মাত্র ৬ দিনের মাথায় মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে শহিদ হন।

৪. হেমন্ত সুহাস জোশী (ডোম্বিভালি): পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের লালসার শিকার হন।

৫. অতুল শ্রীকান্ত মনি (ডোম্বিভালি): রেল কর্মচারী অতুল তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের চোখের সামনেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

৬. সঞ্জয় লক্ষ্মণ লালি (ডোম্বিভালি): অতুল ও হেমন্তের ভাই, শৈশবের বন্ধুদের মৃত্যু হলো একই দিনে, একই স্থানে।

৭. নীরজ উদওয়ানি (৩৩, জয়পুর): দুবাইয়ের এই সিএ-কে পরিচয়পত্র দেখানোর অছিলায় গুলি করে জঙ্গিরা।

৮. বিতন অধিকারী (৩৬, কলকাতা): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত এই ইঞ্জিনিয়ারের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী ছিল তাঁর ৩ বছরের পুত্রসন্তান।

৯. সুদীপ নিউপানে (২৭, নেপাল): এই হামলায় নিহত একমাত্র বিদেশি পর্যটক, যিনি মাথানত করতে অস্বীকার করেছিলেন।

১০. শুভম দ্বিবেদী (৩০, কানপুর): মধুচন্দ্রিমার মধ্যাহ্নভোজ চলাকালীনই তাঁকে প্রথম টার্গেট করে জঙ্গিরা।

১১. প্রশান্ত কুমার সৎপথী (৪১, ওড়িশা): পরিবারের সামনেই ঘাসের মাঠে লুটিয়ে পড়েন এই ওড়িয়া পর্যটক।

১২. মনীশ রঞ্জন (পুরুলিয়া): হায়দ্রাবাদের এই সেকশন অফিসার সপরিবারে তীর্থ করতে গিয়ে আর ফেরেননি।

১৩. এন. রামচন্দ্র (৬৫, কেরালা): নাতি-নাতনিদের নিয়ে শেষবারের মতো কাশ্মীর দেখতে গিয়েছিলেন এই অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

১৪. দীনেশ আগরওয়াল (রায়পুর): নিজের বিবাহবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে জীবনসঙ্গীর চোখের সামনে চিরবিদায় নেন।

১৫. সমীর গুহ (কলকাতা): কেন্দ্রীয় সরকারি এই কর্মচারী তাঁর স্ত্রী ও কন্যার সামনেই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান।

১৬. দিলীপ দেসালে (পানভেল): পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছিল এই বীর পর্যটককে।

১৭. জে. সচিন্দ্র মলি (৬৮, বিশাখাপত্তনম): অবসরপ্রাপ্ত এই প্রবীণ কাশ্মীর দেখার প্রবল উত্তেজনা নিয়ে গিয়েছিলেন, ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে।

১৮. মধুসূদন সোমিসেত্তি (বেঙ্গালুরু): শান্তিময় পারিবারিক ছুটি নিমেষেই রূপ নেয় ট্র্যাজেডিতে।

১৯. সন্তোষ জগদালে (পুনে): কালিমা পড়তে না পারায় তাঁকে প্রাণ দিতে হয়।

২০. মঞ্জুনাথ রাও (শিবমোগ্গা): রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মঞ্জুনাথকে বাঁচাতে তাঁর স্ত্রী নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন।

২১. কৌস্তুভ গণবোটে (পুনে): স্ত্রীর সামনেই তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

২২. ভারত ভূষণ (বেঙ্গালুরু): ছোট ছেলের সামনেই বাবার মৃত্যু এক অসহনীয় যন্ত্রণার ছবি তৈরি করেছিল।

২৩. সুমিত পারমার (১৭, গুজরাট): এই হামলার সর্বকনিষ্ঠ শিকার, যে তাঁর বাবার সঙ্গে আধ্যাত্মিক যাত্রায় গিয়েছিল।

২৪. যতীশ পারমার (৪৫, গুজরাট): নিজের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারান এই বাবা।

২৫. তাগাই হাইলিয়াং (অরুণাচল): বিমান বাহিনীর এই কর্পোরাল নববধূর সঙ্গে ভ্রমণে গিয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিলেন।

২৬. শৈলেশ কালাথিয়া (সুরাট): মুম্বাইয়ে কর্মরত শৈলেশ তাঁর দুই সন্তানের সামনেই জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান।

এক বছর পর আমাদের অঙ্গীকার
এই ২৬ জন কেবল নাম নয়, ২৬টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস। কাশ্মীরের পাহাড়ে আজও প্রতিধ্বনি হয় তাঁদের স্বজনদের কান্না। তবে আদিল শাহের মতো স্থানীয় মুসলিমদের বীরত্ব প্রমাণ করে দেয় যে, সন্ত্রাসবাদ কখনোই সম্প্রীতির বন্ধন ছিঁড়তে পারবে না।

আমরা এই ২৬ জন শহীদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।