পিরিয়ডের সময় তুলসী গাছ ছুঁলে কি সত্যিই শুকিয়ে যায়? জেনে নিন যুগ যুগ ধরে চলা এই প্রথার আসল সত্য!

ভারতীয় সংস্কৃতিতে তুলসী গাছ কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, একে দেবী লক্ষ্মীর রূপ হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় পুজো করা হয়। প্রায় প্রতিটি হিন্দু গৃহস্থের আঙিনায় বা বারান্দায় একটি তুলসী মঞ্চ থাকে, যেখানে নিত্যদিন প্রদীপ জ্বালালে অশুভ শক্তি দূরে থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়। তবে এই পবিত্র উদ্ভিদকে ঘিরে একটি প্রাচীন বিতর্ক আজও বিদ্যমান— পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব চলাকালীন কি মহিলারা তুলসী গাছ ছুঁতে পারেন? বড়দের মতে, এই সময়ে গাছ ছুঁলে তা শুকিয়ে যায় বা অপবিত্র হয়। কিন্তু এর নেপথ্যে আসল সত্যিটা কী?
ঐতিহ্যগত বিশ্বাস ও সংস্কার: সনাতন ধর্মে ঋতুস্রাব চলাকালীন মহিলাদের পবিত্র ও ধর্মীয় কাজ থেকে দূরে রাখার রীতি দীর্ঘদিনের। যেহেতু তুলসীকে দেবী হিসেবে জ্ঞান করা হয়, তাই মন্দিরে প্রবেশের মতো তুলসী মঞ্চে যাওয়া বা তাতে জল ঢালাও নিষিদ্ধ ছিল। মূলত ‘অশৌচ’ বা অপবিত্রতার ধারণা থেকেই এই বারণের সূত্রপাত।
বিজ্ঞান কী বলছে? বিজ্ঞান কিন্তু এই ‘গাছ শুকিয়ে যাওয়ার’ তত্ত্বকে সমর্থন করে না। একটি গাছের বৃদ্ধি বা শুকিয়ে যাওয়া নির্ভর করে সঠিক জল, সূর্যালোক, মাটি এবং পুষ্টির ওপর। মানুষের শরীরের হরমোনের পরিবর্তনের সাথে গাছের সজীবতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক কোনো গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। তাই পিরিয়ডের সময় কেউ ভুল করে গাছ ছুঁয়ে ফেললে অলৌকিক কোনো ক্ষতি হবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
কেন তবে এই কঠোর নিয়ম? পুরনো দিনে মহিলাদের ঘর ও বাইরের প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো। পিরিয়ডের দিনগুলিতে পেটে ব্যথা, ক্লান্তি এবং শারীরিক অস্বস্তি থাকে। সেই সময়ে তাঁদের পূর্ণ বিশ্রামের সুযোগ করে দিতেই ‘অশুচি’ তকমা দিয়ে বাড়ির ভারী কাজ এবং ধর্মীয় আচার থেকে দূরে রাখা হতো। এটি ছিল মূলত এক প্রকার বাধ্যতামূলক ছুটির ব্যবস্থা। এছাড়া সেই সময়কার স্যানিটেশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হতো।
পরিশেষে, ভক্তি থাকে মনের গভীর কোণে। শারীরিক নিয়ম বা প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে ভক্তি ও বিশ্বাস। পিরিয়ডের সময় তুলসী গাছ স্পর্শ করলে কোনো অঘটন ঘটবে— এমন অহেতুক ভীতি কাটিয়ে যুক্তি ও আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধন ঘটানোই আজ সময়ের দাবি।