ভোর থেকে গভীর রাত চলে বাঁশের সঙ্গে যুদ্ধ! অভাবের সংসারেও কীভাবে বেঁচে আছে শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্প?

আধুনিক প্লাস্টিকের রমরমা বাজারেও অস্তিত্ব হারায়নি বাংলার মাটির শিল্প। পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর বিধানসভার কলাবনীর কালিন্দী পাড়া আজও বহন করে চলেছে শত বছরের পুরনো এক ঐতিহ্য। এখানকার মানুষের কাছে বাঁশ মানে কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, বরং বাঁশই তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশের কুলো, খাঁচা আর গৃহস্থালির টুকিটাকি সরঞ্জাম তৈরি করেই আজ রাজ্যের দরবারে পৌঁছে যাচ্ছে এই গ্রামের নাম।
ঘরে ঘরে শিল্পী, হাতে নেই বিশ্রাম কলাবনীর কালিন্দী পাড়ার প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পরিবার বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেখানে গেলে দেখা যাবে, প্রতিটি বাড়ির উঠোনে স্তূপাকারে রাখা বাঁশ আর সেই বাঁশকে ঘিরে চলে শৈল্পিক কারুকার্য। ভোর হওয়ার আগে থেকেই শুরু হয় কাজ, যা চলে মাঝরাত পর্যন্ত। পূর্বপুরুষদের শিখিয়ে দেওয়া এই শিল্পকেই এখন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় সকলেই।
অভাব আছে, তবু নেই অভিযোগ গ্রামের বাসিন্দা পূর্ণিমা কালিন্দী ও সন্ধ্যা কালিন্দীরা জানান, হাড়ভাঙা খাটুনি থাকলেও লাভের গুড় সবসময় তাদের ঘরে আসে না। পূর্ণিমাদেবীর কথায়, “পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক অনেক কম। তবুও আমরা এই কাজ ছাড়তে পারি না। কারণ আমাদের পরিচয় এই শিল্পের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।” তবে আশার কথা এই যে, স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে এদের তৈরি পরিবেশবান্ধব এই সামগ্রী এখন রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও পাড়ি দিচ্ছে।
ঐতিহ্যের জয়গান: নেই আধুনিকতার ছোঁয়া বাঁশের তৈরি কুলো এবং খাঁচার চাহিদা গ্রামবাংলার পাশাপাশি এখন শহরাঞ্চলেও বাড়ছে। দিনমজুর এই শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া প্রতিটি জিনিসই যেন এক একটি জীবন্ত শিল্পকর্ম। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিপণনের আরও সুযোগ পেলে এই শতাব্দী প্রাচীন শিল্পটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
উপসংহার শতাব্দীপ্রাচীন এই লোকশিল্প কালিন্দী পাড়ার মানুষের কাছে কেবল আয়ের পথ নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে পরিবেশবান্ধব বাঁশজাত পণ্যের এই লড়াই আদতে ঐতিহ্যের বেঁচে থাকার লড়াই। আর এই লড়াইয়ের কারিগররাই আজও টিকিয়ে রেখেছেন বাংলার আসল রূপকে।