৩২ বছরের নিরলস সাধনার স্বীকৃতি, পেপার ম্যাচি শিল্পকর্মে জাতীয় পুরস্কার পেলেন নবদ্বীপের অঙ্কন শিক্ষক

নদীয়ার নবদ্বীপের তেঘড়িপাড়া, সুধাংশু চ্যাটার্জী রোডের বাসিন্দা শিব শংকর সাঁধুখা আজ শুধু নদিয়া নয়, গোটা বাংলার গর্ব। পেশায় অঙ্কন শিক্ষক হলেও শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বিগত প্রায় ৩২ বছর ধরে তিনি পেপার ম্যাচি বা কাগজের মণ্ড দিয়ে শিল্পকর্ম করে চলেছেন। তাঁর এই নিরলস সাধনার ফলস্বরূপ চলতি বছরের ৯ ডিসেম্বর দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে তিনি জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করেন।
শিল্প মহলের মতে, এর আগেও শিব শংকর বাবু একাধিক জেলা ও রাজ্য স্তরের পুরস্কার, এমনকি ন্যাশনাল মেরিট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সরাসরি জাতীয় স্তরের পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁর দীর্ঘ শিল্পী জীবনের এক অনন্য মাইলফলক।
পেপার ম্যাচি: এক ব্যতিক্রমী শিল্প মাধ্যম
শিব শংকর সাঁধুখা যে পেপার পাল্প বা কাগজের মণ্ড দিয়ে কাজ করেন, তার তৈরির পদ্ধতিও ব্যতিক্রমী। পুরনো বাতিল কাগজ জল দিয়ে ভিজিয়ে নরম করার পর চিপে কাদার মতো উপাদান তৈরি করা হয়। এরপর তার সঙ্গে আঠা মিশিয়ে এমন এক মাধ্যম তৈরি হয়, যা শুকিয়ে গেলে মাটির চেয়েও শক্ত, অথচ ওজনে হালকা হয়। এই হালকা হওয়ার সুবিধার কারণে বড় আকারের শিল্পকর্ম তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হয়।
এই কাগজের মণ্ড দিয়েই শিল্পী একের পর এক অনবদ্য শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। দেবদেবী, জীবজন্তু, থালা-বাসন থেকে শুরু করে নান্দনিক মডেল—সবই তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। এর আগে তিনি কুমির, চৈতন্যদেব ও বুদ্ধদেবের মূর্তি, গণেশ, অশোক স্তম্ভ এবং বিভিন্ন বনসাই মডেল তৈরি করেছেন।
‘ইন্ডিয়ান ওয়াটার সেভিং উইম্যান’ মডেলের জন্য জাতীয় সম্মান
তবে যে বিশেষ শিল্পকর্মটির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারে নির্বাচিত হয়েছেন, সেটি হল ‘ইন্ডিয়ান ওয়াটার সেভিং উইম্যান’। জল সংরক্ষণের সামাজিক বার্তা তুলে ধরা এই মডেলটি প্রতিযোগিতায় বিচারকমণ্ডলীর বিশেষ নজর কাড়ে। এর বিষয়বস্তু, গভীর ভাবনা এবং নিখুঁত শিল্পনৈপুণ্যের জন্য ভারত সরকার এটিকে সেরা মডেল হিসেবে বিবেচনা করে এবং তিনি এই সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান লাভ করেন।
শিব শংকর বাবু জানান, প্রথমে শখের বশে শুরু হলেও এই শিল্পই আজ তাঁর নেশা এবং পেশা দু’টোই হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মতো শহর থেকেও তাঁর কাছে অর্ডার আসছে। বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনী এবং অনলাইন মাধ্যমে তিনি তাঁর তৈরি শিল্পকর্ম খুচরো ও পাইকারি বিক্রি করেন। নবদ্বীপের এই শিল্পীর সাফল্য আগামী প্রজন্মের তরুণ শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করবে।