মুঘলরা কি ভারতের ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল? ড. আম্বেদকরের চোখে মুঘল ইতিহাস, অবাক হবেন!

ভারতীয় ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্যকে প্রায়শই জাঁকজমক ও স্থিতিশীল রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং ঐতিহাসিক ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর তাঁর নিজস্ব মানদণ্ডে মুঘলদের মূল্যায়ন করেছিলেন—যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার, জাতি এবং নিপীড়িত শ্রেণীর অবস্থাই ছিল মূল ফোকাস।
ডঃ আম্বেদকর মুঘলদের উপর আলাদা কোনো গ্রন্থ না লিখলেও তাঁর ‘পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া’ সহ একাধিক রচনা এবং বক্তৃতায় মুঘল আমলকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত ‘মুঘল গৌরব’ বা ‘ঘৃণা-চালিত সমালোচনা’ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা আম্বেদকরের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
আম্বেদকরের সমালোচনার দুই মানদণ্ড
ডঃ আম্বেদকর মূলত দুটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ইতিহাস বিচার করতেন: ১. ক্ষমতা কাঠামোয় সাধারণ মানুষের অবস্থা এবং ২. শূদ্র, অস্পৃশ্য ও মহিলাদের সামাজিক ন্যায়বিচার ও মর্যাদা।
আম্বেদকরের মতে, মুঘল সাম্রাজ্য ছিল একটি সামরিক-ভিত্তিক, কেন্দ্রীভূত এবং সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে কৃষকদের উপর ভারী কর এবং জমিদার ব্যবস্থা ছিল। তাই মুঘলদের তিনি কখনোই গণতান্ত্রিক বা সমতাবাদী শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো শাসকের উদারতা যদি শুধুমাত্র শাসক শ্রেণী এবং ধর্মীয় অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সামাজিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে তাকে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া যায় না।
আকবর ও বর্ণ প্রথার স্থায়িত্ব
আকবরকে সাধারণত ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আম্বেদকর স্বীকার করেন যে আকবরের নীতি তুলনামূলকভাবে উদার ছিল, কিন্তু তিনি সেটিকে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কৌশল হিসেবেই বেশি দেখেছিলেন, সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক উদারতা হিসেবে নয়।
মুঘল দরবারের উচ্চ পদগুলি অভিজাত ও সামরিক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। শূদ্র, অস্পৃশ্য বা সাধারণ কৃষকদের জন্য ক্ষমতা কাঠামোয় কোনো পথ ছিল না। আম্বেদকর উল্লেখ করেন, মুসলিম শাসকরা ভারতে এলেও হিন্দু সমাজের বর্ণ কাঠামো ধ্বংস করেননি; বরং ব্রাহ্মণ্যবাদ ও উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় ছিল।
ধর্মান্তরের প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিপুল সংখ্যক দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণী সামাজিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে ইসলাম গ্রহণ করলেও মুসলিম সমাজের মধ্যেও আশরাফ-আজলাফের মতো শ্রেণী বিভাজন গড়ে ওঠে। মুঘলদের মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব ও ক্ষমতার স্থিতিশীলতা, সামাজিক বিপ্লব বা বর্ণ বিলুপ্তি তাদের অগ্রাধিকার ছিল না।
মুঘল আমল এবং জাতি গঠন
আম্বেদকরের মতে, মুঘলরা নিজেদেরকে স্থায়ী জাতীয় শাসক হিসেবে দেখত না, বরং সাম্রাজ্যবাদী বিজেতা হিসেবে দেখত। তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল বিশাল ভূখণ্ডে প্রশাসনিক ঐক্য এবং কেন্দ্রীকরণ প্রতিষ্ঠা করা, যা পরে ব্রিটিশরা ব্যবহার করে। তবে এটি কোনো জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐক্য ছিল না, বরং সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ছিল।
আম্বেদকর জোর দিয়ে বলেন, মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা শোষণমূলক ছিল; উৎপাদিত সম্পদের সিংহভাগই জমিদার ও রাষ্ট্রের হাতে যেত। জমিতে নিম্নবর্ণের মানুষরা শ্রমিক হিসেবেই থেকে যায়। মুঘল দরবার প্রাসাদ এবং বিলাসবহুল জিনিসে প্রচুর সম্পদ ব্যয় করত, অথচ জনকল্যাণ বা সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ ছিল খুব কম।
ডঃ আম্বেদকরের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো: মুঘল শাসন ছিল একটি কেন্দ্রীভূত সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র যা প্রশাসনিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক সুরক্ষা দিলেও, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বর্ণ বিলোপের দিকে কোনো মৌলিক বিপ্লব আনেনি। তাঁর মতে, ইতিহাসকে কেবল বিজয়ী এবং রাজপ্রাসাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও দেখা উচিত।