এলইডি নয়, আজও কেন জ্বলছে বাঁশের ডগায় সেই ‘আকাশপ্রদীপ’? এর পেছনের কারণ জানলে চমকে যাবেন!

শহর জুড়ে এখন উৎসবের মেজাজ। দীপাবলির প্রাক্কালে আধুনিক এলইডি টুনি আর আতসবাজির দাপটে ক্রমশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠছে রাতের আকাশ। তবে এই চাকচিক্যের ভিড়েও কোথাও কোথাও পুরনো রীতিগুলো যেন আজও স্বমহিমায় বিরাজমান। আজও বহু বাড়ির ছাদে বা উঠোনের এক কোণে লম্বা বাঁশের ডগায় টিমটিম করে জ্বলে আকাশপ্রদীপ। এই স্নিগ্ধ আলো যেন এক চিরন্তন বার্তা বহন করে চলেছে। কিন্তু আধুনিক প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই প্রদীপ জ্বালানোর তাৎপর্য অজানা।

এই বিশেষ প্রথাটির নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় লোকবিশ্বাস, পুরাণ আর বহু বছরের ঐতিহ্যের দিকে।

১. পিতৃপুরুষদের পথ দেখানোই প্রধান কারণ
আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর সবচেয়ে প্রধান এবং প্রচলিত কারণটি হলো পিতৃপুরুষদের পথ দেখানো। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার পুণ্যতিথিতে পূর্বপুরুষরা জল-তর্পণে তুষ্ট হয়ে মর্ত্যে নেমে আসেন এবং দীপাবলি পর্যন্ত নিজ নিজ পরিবার-পরিজনের কাছাকাছি অবস্থান করেন। দীপাবলির অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে তাঁদের স্বর্গলোকে ফেরার পথ যাতে গুলিয়ে না যায়, সেই পথ আলোকিত করার জন্যই বংশধরেরা উঁচু জায়গায় আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে দেন। এই স্নিগ্ধ আলো তাঁদের যাত্রাপথকে সুগম করে তোলে। এটি একদিকে যেমন পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর মাধ্যম, তেমনই তাঁদের আত্মার শান্তিকামনার প্রতীক।

২. শ্রীরামচন্দ্রের বিজয় বার্তা
আকাশপ্রদীপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি পৌরাণিক কাহিনি। চোদ্দ বছর বনবাস ও লঙ্কাজয়ের পর দীপাবলির দিনই শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরেছিলেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের আনন্দে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগর দীপমালায় সাজিয়ে তুলেছিল। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করেও অনেকে আকাশপ্রদীপ জ্বালান। উঁচু জায়গায় রাখা এই প্রদীপ যেন দূর থেকে বিজয়ীর ঘরে ফেরার পথকেই আলোকিত করে।

৩. দেবীকে আগমনীর আমন্ত্রণ
দীপাবলি হল ধন ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী এবং শ্যামা মায়ের (কালী) পূজা-আর্চার উৎসব। বিশ্বাস করা হয়, এই অমাবস্যার রাতে দেবী তাঁর ভক্তের গৃহে পদার্পণ করেন। নিজের বাড়িকে দেবীর কাছে আরও আকর্ষণীয় ও উজ্জ্বল করে তুলতে, এবং অন্ধকার দূর করে তাঁর আগমনকে স্বাগত জানাতে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত। এটি যেন দেবীকে গৃহে আসার জন্য এক আলোর আমন্ত্রণ।

এই সমস্ত কারণের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। দীপাবলির অমাবস্যা বছরের সবচেয়ে অন্ধকার রাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। আকাশপ্রদীপ এই বাহ্যিক অন্ধকারের পাশাপাশি আমাদের অন্তরের অজ্ঞানতা, বিদ্বেষ এবং সকল প্রকার নেতিবাচকতা ভাবনার অন্ধকারকে দূর করার প্রতীক। এটি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মঙ্গলের জয় ঘোষণা করে।

আজকের দিনে হয়তো আকাশপ্রদীপের জৌলুস কমেছে, কিন্তু তার গুরুত্ব কমেনি। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, আধুনিকতার হাজারো রোশনাইয়ের মধ্যেও এক চিলতে স্নিগ্ধ আলো নিয়ে দীপাবলির আকাশকে আজও অর্থবহ করে তোলে এই আকাশপ্রদীপ—যা ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং শুভকামনার এক অনির্বাণ শিখা।