অর্ধেক কালী অর্ধেক কৃষ্ণ! বারাসতে সেজে উঠছে কৃষ্ণকালী প্রতিমা, কেন পুরসভার চেয়ারম্যানের পূজায় এল ‘হে বঙ্গভূমি’ থিম?

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সদর শহর বারাসতের কালীপুজোর জাঁকজমক এবং ঐতিহ্য গোটা রাজ্যেই সুবিদিত। রকমারি মণ্ডপ, চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা এবং বিগ বাজেটের পূজার কারণে বারাসতের কালীপুজোর খ্যাতি দেশজোড়া। দুর্গাপূজা শেষের আগেই বারাসতে শুরু হয়ে যায় কালীপূজার মণ্ডপ তৈরির তোড়জোড়। হাতে সময় কম থাকায় দিন-রাত এক করে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। বারাসতে শতাধিক ছোট-বড় পূজার মধ্যে বিগ বাজেটের চারটি প্রধান পূজার আকর্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আমরা সবাই ক্লাব: থিম ‘দ্বারকা’ (৯ বছরে পদার্পণ)
বয়সে নবীন হলেও ইতিমধ্যেই এই ক্লাবের খ্যাতি রাজ্যজুড়ে। এই বছর ক্লাবের থিম হলো শ্রীকৃষ্ণের পৌরাণিক নগরী ‘দ্বারকা’।

থিম ভাবনা: পুরান মতে সমুদ্রপৃষ্ঠে অবস্থিত দ্বারকা নগরী সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সেই নগরীই এবার উঠে এসেছে মণ্ডপে।

মণ্ডপসজ্জা: পুজো মণ্ডপে দ্বারকা নগরীর সাতটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যার প্রতিটি আলাদা নকশার। কোথাও থাকবে কৃষ্ণলীলা, গোপীদের আরাধনা, আবার কোথাও ফুটে উঠবে মহাভারতের চিত্র। বাঁশ, কাঠ ও ফাইবার ব্যবহার করা হচ্ছে মণ্ডপ গড়তে।

প্রতিমা: মণ্ডপের ভিতরে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতা এবং ১৫ ফুট চওড়ার সিংহাসনে উপবিষ্ট থাকবে ‘কৃষ্ণকালী’ রূপে মাতৃ প্রতিমা। অর্থাৎ প্রতিমার অর্ধেক কালী এবং অর্ধেক কৃষ্ণ।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: পুজো কমিটির প্রধান কর্মকর্তা অরুণ ভৌমিক জানান, বাস্তব সমুদ্রপৃষ্ঠ করা না গেলেও, শ্রীকৃষ্ণের নগরী এবং তার সাতটি কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই অভিনব ভাবনায় দর্শনার্থীদের ঢল নামবে।

২. কেএনসি রেজিমেন্ট: থিম ‘হে বঙ্গভূমি, হে অন্তর্যামী’ (৬৬তম বর্ষ)
বারাসতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং জাঁকজমকপূর্ণ পুজো এটি।

থিম ভাবনা: মূলত বাঙালি অস্মিতা ও বাংলা ভাষাকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে এই মণ্ডপ। ভিন রাজ্যে বাংলাদেশি সন্দেহে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালিকে অবনমন করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই মূল উদ্দেশ্য।

মণ্ডপসজ্জা: মণ্ডপজুড়ে থাকছে বাংলার মনীষীদের নানা কর্মকাণ্ড। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সহ একাধিক সাহিত্যিকের অবদান তুলে ধরা হয়েছে বাঁশ, ফাইবার ও টেরাকোটার মাধ্যমে।

উদ্বোধন: পুজো কমিটির সম্পাদক তথা বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায় জানান, ১৮ অক্টোবর শনিবার মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এই পুজোর উদ্বোধন করবেন।

৩. সন্ধানী ক্লাব: থিম মায়াপুরের ইসকন মন্দির (৬৫তম বর্ষ)
বারাসত ১১ নম্বর রেলগেট সংলগ্ন জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত এই বড় বাজেটের পুজো।

থিম ভাবনা: এবারের থিম বাংলার স্থাপত্য মায়াপুরের ইসকন মন্দির।

মণ্ডপসজ্জা: ১০২ ফুট উঁচু এবং ১২০ ফুট দীর্ঘ মণ্ডপটি এক ঝলক দেখলে মায়াপুরের ইসকন মন্দিরের নতুন আদল মনে হবে। তবে ভিতরের দিকটা থাকছে ইসকনের পুরনো মন্দিরের আদলে তৈরি কারুকার্যে। ফাইবার ও প্যারিস দিয়ে সেজে উঠছে মণ্ডপ।

বিশেষ আকর্ষণ: মণ্ডপ চত্বরে কৃষ্ণের নাম-সংকীর্তনের বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে। চন্দননগরের চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হবে চৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবনা।

প্রতিমা: এই পুজোতেও কৃষ্ণ রূপে কালী অর্থাৎ কৃষ্ণকালী প্রতিমা তৈরি করছেন শিল্পী তারক পাল।

৪. বালকবৃন্দ স্পোর্টিং ক্লাব: থিম চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির (৬৪তম বর্ষ)
বরাবরের মতো এবারও টাকি রোডের পাশে সেজে উঠছে এই ক্লাবের মণ্ডপ।

থিম ভাবনা: এই বছর তাঁদের থিম দক্ষিণ ভারতের চামুণ্ডা পাহাড়ের উপর অবস্থিত চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির।

মণ্ডপসজ্জা: মাইসোর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে থাকা মন্দিরের সূক্ষ্ম কারুকার্য কাঁথির শিল্পীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফোম, পাট ও পাটজাত দ্রব্য দিয়ে।

প্রতিমা: প্রতিমাতেও থাকছে বিশেষত্ব। মাটি ও ঝিনুক ব্যবহার করে নির্মাণ করা হচ্ছে মাতৃ প্রতিমা।

বারাসতের এই বিগ বাজেটের পুজো কমিটিগুলি জাঁকজমক এবং থিমের অভিনবত্বে একে অপরকে টেক্কা দিতে প্রস্তুত।