এভারেস্টের উচ্চতা যিনি মেপেছিলেন, তাঁর নাম জুটেছিল ‘কাঁচকলা’! ইতিহাস ভুলে যাওয়া সেই বাঙালি গণিতজ্ঞ কে?

সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায়, “বাঙালী আপন দেশে ব’সে, এভারেস্টের গায়ে ফিতে না লাগিয়ে, চূড়োয় চড়তে গিয়ে খামখা জান না দিয়ে ইংরেজকে বাৎলে দেয়নি, ঐ দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়?”—বাঙালির সেই প্রশ্নাতীত দক্ষতার প্রতীক ছিলেন এক বিস্মৃত গণিতজ্ঞ, রাধানাথ শিকদার। এভারেস্টের বরফের ঢালে না দাঁড়িয়ে, কেবল ত্রিকোণমিতির ফিতে দিয়েই যিনি মেপে ফেলেছিলেন বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গের উচ্চতা!

১৮৫২ সাল। ব্রিটিশরা হিমালয়ের একটি শৃঙ্গকে ‘পিক ১৫’ নামে চিহ্নিত করত। সেসময় ‘গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’-র বাঙালি কর্মচারী রাধানাথ শিকদার তাঁর অসাধ্য সাধনে নামেন। ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে তিনি মেপে ফেললেন সেই ‘পিক ১৫’-এর উচ্চতা।

১৮৫৬ সালে সেই ‘পিক ১৫’-এর নামকরণ করা হয় ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জর্জ এভারেস্টের নামে। অথচ, যার গাণিতিক প্রতিভা ও দক্ষতার জোরে এই উচ্চতা নির্ণীত হল, সেই বাঙালি রাধানাথের কপালে জুটল ‘কাঁচকলা’। লেখক জন কী তাঁর বই The Great Arc: The Dramatic Tale of How India Was Mapped and Everest Was Named-এ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, “এভারেস্ট নন, রাধানাথই প্রথম বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গটিকে মানচিত্রে বসিয়েছিলেন।”

১৮১৩ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় রাধানাথের জন্ম। ১৮৩১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি জর্জ এভারেস্টের সার্ভে-তে যোগ দেন। সেসময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৩০ টাকা। এভারেস্টের অবসরের পর সার্ভে-এর দায়িত্বে আসেন কর্নেল অ্যান্ড্রু স্কট ওয়াহ।

১৮৫২ সালে রাধানাথ হিমালয়ের শৃঙ্গগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়েই খুঁজে পান সেই চরম সত্য। তিনি প্রমাণ করেন, হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়। বরং ‘পিক ১৫’-এর উচ্চতা ২৯ হাজার ফুট বা প্রায় ৮৮৩৯ মিটার। পরে ১৮৫৬ সালে কর্নেল অ্যান্ড্রু স্কট আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ২৯,০০২ ফুট হিসাবে ঘোষণা করেন।

তবে, যিনি শৃঙ্গটিকে চোখেই দেখেননি, সেই জর্জ এভারেস্টের নামেই পর্বতটির নামকরণ হয়—বাদ পড়ে যায় সেই বাঙালি গণিতজ্ঞের নাম। রাধানাথ শিকদার এভারেস্টের উচ্চতা মাপতে বরফের ঢালে দাঁড়াননি, তিনি কলকাতায় বসেই ত্রিকোণমিতির ফিতে লাগিয়ে মেপেছিলেন এভারেস্টকে। আমাদের এই গর্বের গণিতজ্ঞ জীবিত অবস্থায় বা তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রাপ্য আসল স্বীকৃতি পাননি। ভবিষ্যতে কি সেই ইতিহাস সংশোধিত হবে? সেই উত্তর কিন্তু আজও অধরা।