ডেঙ্গু ভাইরাসের কিছু লক্ষণ ও কখন যাবেন হাসপাতালে জেনেনিন
ডেঙ্গু (সমার্থক ভিন্ন উচ্চারণ ডেঙ্গি), মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগ। কয়েক প্রজাতির স্ত্রী এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক, যেগুলোর মধ্যে এডিস ইজিপ্টি প্রধান। ট্রপিক্যাল-সাবট্রপিক্যাল অঞ্চলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। বিশ্বের প্রায় ১১০টি দেশে এই রোগ দেখা গেছে।
ডেঙ্গু বেশির ভাগ হয়ে থাকে অনূর্ধ্ব ১৫ বছর বয়সে। ট্রপিক্যাল রোগ হিসেবে ম্যালেরিয়ার পরই ডেঙ্গুর স্থান। ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চহার লক্ষ করা যায় বর্ষাকালে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য
এটি এক সূত্রকবিশিষ্ট আরএনএ ভাইরাস। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর নাম হলো ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। কোনো ব্যক্তি যে টাইপের দ্বারা আক্রান্ত হবে, সেরে ওঠার পর সেই ব্যক্তি সেই টাইপের বিরুদ্ধে জীবনব্যাপী রোগ প্রতিরোধী শক্তি লাভ করে। কিন্তু অন্যবার তার অন্য টাইপ দ্বারা আবারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এ ছাড়া একাধিক টাইপে বা দ্বিতীয়বার আক্রান্তের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা থাকে অনেক বেশি।
লক্ষণ
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সাধারণত চার থেকে সাত দিনের মধ্যে (তিন থেকে ১৪ দিন) রোগের উপসর্গ দেখা যায়। এই সময়কালকে বলা হয় ‘ইনকুবেশন পিরিয়ড’। উপসর্গাদি ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্তরা থাকে উপসর্গবিহীন। অথবা থাকে সাধারণ জ্বরের মতো সামান্য উপসর্গ।
১. অনুমিত ডেঙ্গু
প্রথম এক থেকে পাঁচ দিন : হঠাৎ উঁচু মাত্রার জ্বর, যা প্রায় ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত উঠতে পারে। জ্বর বাড়ার সময় শরীরে কাঁপুনি থাকে।
জ্বরের সঙ্গে নিচের যেকোনো দুটি—
♦ বমি ভাব, বমি
♦ র্যাশ—উপসর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে চামড়ায় লাল ফুসকুড়ি অথবা অসুখের চার থেকে সাত দিনের মধ্যে হামের মতো লাল বিন্দু ত্বকের র্যাশ দেখা যায়, যা হাতের আঙুলের চাপে মিলিয়ে যায়, ছেড়ে দিলে আবার ভেসে ওঠে।
♦ হাড়ের জোড়ায় গাঁইট ও মাংসপেশিতে প্রবল ব্যথার কারণে এ রোগের আরেক নাম ‘হাড় ভাঙা জ্বর’ বা ‘ব্রেক বোন ফিভার’। থাকে তীব্র শিরঃপীড়া, অক্ষিকোটরের পেছনে ব্যথা।
♦ পজিটিভ টুর্নিকোয়েট টেস্ট
♦ রক্তে শ্বেতকণিকার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া
♦ অন্যান্য মারাত্মক লক্ষণ।
২. বিপজ্জনক সব লক্ষণ
♦ পেট ব্যথা
♦ অনবরত বমি
♦ শরীরে জল জমা
♦ নাক, মাড়ি থেকে আপনা-আপনি সামান্য ধরনের রক্তপাত।
♦ অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা
♦ লিভার স্ফীতি—দুই সেন্টিমিটারের বেশি
♦ ল্যাব পরীক্ষায়—রক্তে হিমাটোক্রিটের মান বৃদ্ধি, অণুচক্রিকা দ্রুত কমতে থাকা।
৩. মারাত্মক ডেঙ্গুর চিহ্নাদি (পাঁচ থেকে সাত দিন সময়কালে)
♦ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (যা ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়)
♦ জল জমা—বিশেষত্ব ফুসফুসে, শ্বাসকষ্ট। শীতল শরীর, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কম, দুর্বল নাড়ি।
♦ অতিরিক্ত রক্তপাত
♦ লিভার স্ফীতি—এএসটি বা এএলটি—১০০০ বা বেশি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হার্ট ও অন্যান্য অঙ্গে রোগের লক্ষণ।
ডেঙ্গুর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা
♦ প্রথম সাত দিনে পিসিআর, ভাইরাল অ্যান্টিজেন ডিটেকশন। অসুখের পাঁচ-সাত দিন পর থেকে সেরোলজি টেস্টে আইজি অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ।
♦ রক্তে অণুচক্রিকার স্বাভাবিক মান ১,৫০,০০০ থেকে ২,৫০,০০০/প্রতি মিলি। ডেঙ্গুতে তা দ্রুত কমে যায়। তা যদি ২০,০০০/প্রতি মিলির নিচে থাকে, তবে রোগী মারাত্মক রোগ জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু রোগীর অবস্থার উন্নতি হতে থাকলে দু-চার দিনের মধ্যে অণুচক্রিকার কাউন্ট বেড়ে যেতে থাকে।
♦ রক্তে হিমাটোক্রিটের বাড়তি মান—রক্তের প্লাজমা, কেপিলারি লিকেজ হয়ে টিস্যুতে নিঃসরিত হওয়ায় এটা ঘটে। রক্তের শ্বেতকণিকা কমে যাওয়া, অ্যালবুমিন মান কমে যাওয়া ল্যাব টেস্টে ধরা পড়ে।
♦ বুক ও পেটে জল জমা নির্ণয়ে যথাক্রমে বুকের এক্স-রে ও পেটের আলট্রাসাউন্ড।
♦ যেসব জায়গায় রক্তের অণুচক্রিকা পরীক্ষার সুযোগ নেই, সেখানে ‘টুর্নিকোয়েট টেস্ট’ করে দেখা। এই পরীক্ষায় রক্ত চাপ মাপার প্রেশার- কাপ পাঁচ মিনিট ধরে বাহুতে বেঁধে রাখলে ত্বকে রক্তবিন্দু দানা দেখা যাবে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা
ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে সাধারণ ডেঙ্গু রোগী আরোগ্য লাভ করে। প্রায় ৮৫ শতাংশ ডেঙ্গু থাকে সাধারণ মাত্রার, বাড়িতে যা চিকিৎসা করানো সম্ভব। যেমন—
♦ জ্বর লাঘবে প্যারাসিটামল। এসপিরিন বা এজাতীয় ওষুধ কখনোই জ্বর নিবারণে ব্যবহার না করা।
♦ পরিপূর্ণ বিশ্রাম। বেশি বেশি তরল খাবার ও পানীয় পান।
♦ ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা গ্রহণ। বিশেষত জ্বর সম্পূর্ণ চলে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার পর যদি রোগী বেশি অসুস্থতা অনুভব করে, তবে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া।
♦ মারাত্মক রূপ ধারণ করলে প্রয়োজনে রক্ত বা প্লাজমা সঞ্চালন।
♦ সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েডের কোনো ভূমিকা নেই। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থাদি।