মৃত্যুর আগে ‘রাহুল গান্ধী’ বলে চিৎকার! দলিত যুবককে বিবস্ত্র করে গণপিটুনি, রাজনীতিতে তোলপাড় যোগীরাজ্য

উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলীতে এক দলিত যুবককে পিটিয়ে মারার ঘটনায় পুলিশের চূড়ান্ত গাফিলতির যে হিমশীতল চিত্র সামনে এসেছে, তাতে গোটা দেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সময়মতো পুলিশি হস্তক্ষেপ হলে হয়তো বাঁচানো যেত একটি তরতাজা প্রাণ— এই প্রশ্ন এখন বিরোধীদের মুখে। তাঁদের দাবি, বিজেপির শাসনে দলিতদের নির্যাতিত হওয়াই যেন নতুন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২ অক্টোবর রাতে। ফতেপুরের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সি হরিওম পাসোয়ানকে গাদাগঞ্জ এলাকায় ‘ড্রোন চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে মারে উন্মত্ত জনতা। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরপ্রদেশে হোয়াটসঅ্যাপ ও স্থানীয় গুজবের মাধ্যমে ‘ড্রোন চোর’ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে, যার জেরেই গ্রামীণ এলাকায় গভীর সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিওতে নৃশংসতার প্রমাণ
ঘটনার একাধিক ভিডিও নেটমাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে। সবথেকে মর্মান্তিক তৃতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে হরিওমকে বিবস্ত্র করে বেঁধে রেখে উন্মত্ত জনতা লাঠি ও বেল্ট দিয়ে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে। তাঁর গোপনাঙ্গে আঘাত করা হয় এবং যন্ত্রণায় চিৎকার করলে মুখে জল ঢেলে দেওয়া হয়।
এই সময়েই হামলাকারীরা বিদ্রূপ করে বলছে, “আমরা বাবা’র লোক”। হরিওম সাহায্যের জন্য “রাহুল গান্ধী” বলে চিৎকার করলে তাঁর উপর আরও নির্মম প্রহার নেমে আসে।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তায় প্রশ্নের মুখে যোগী প্রশাসন
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দীর্ঘক্ষণ ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনা চললেও পুলিশ বারবার সাহায্যের আর্তি উপেক্ষা করেছে।
রাত প্রায় ৯টা নাগাদ হরিওমকে ঘিরে প্রায় ৬০ জন গ্রামবাসী জড়ো হয়। মণীশ যাদব নামে এক যুবক গাদাগঞ্জের এসএইচও দয়ানন্দ তিওয়ারিকে ফোন করে পুলিশের হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন।
থানা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব মাত্র দশ মিনিট হওয়া সত্ত্বেও ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পুলিশ আসেনি।
রাত ৯টা ৪৮ মিনিটে পুলিশের একটি গাড়ি পৌঁছলেও, সিনিয়র পুলিশকর্মী জয়সিংহ যাদব অভিযুক্ত যুবককে উদ্ধার করতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “গাড়ি চালু কর। জ্ঞান দিস না। যেখানে যেতে চায়, যেতে দে।” এরপর হরিওমকে উন্মত্ত জনতার ভিড়ে ফেলে রেখে পুলিশ চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরই হরিওমকে উনচাহার থানা এলাকার ঈশ্বরদাসপুর গ্রামে ফের ধরে জনতা নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। সাহায্য যখন পৌঁছয়, হরিওম তখন অর্ধমৃত। পরে জনতা তাঁর দেহ রেললাইনের কাছে ফেলে দেয়। পরদিন সকালে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়।
রাজনৈতিক শোরগোল: পিঙ্কির দাবি
নিহত হরিওমের স্ত্রী পিঙ্কি, যিনি উনচাহারের এনটিপিসি-তে পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে কর্মরত, জানিয়েছেন তাঁর স্বামী মানসিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার স্বামী চোর ছিলেন না। নিরপরাধ ছিলেন। জনতা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ওঁকে পশুর মতো মেরেছে। ওঁকে যে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, অপরাধীদেরও যেন সেই একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।”
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল পড়েছে। কংগ্রেস সূত্রে খবর, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী নিজে ফোন করে নিহতের পরিবারকে সমস্ত রকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই যোগী আদিত্যনাথ সরকারের বিরুদ্ধে “জঙ্গলরাজ”-এর অভিযোগ তুলেছেন।
গোটা ঘটনায় রীতিমতো ব্যাকফুটে বিজেপি। উপ-মুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক ঘটনাটিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” আখ্যা দিয়ে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রায়বরেলীর এসপি যশবীর সিংহ কর্তব্যে গাফিলতির জন্য উনচাহারের এসএইচও-সহ ছয় পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করেছেন। এই ঘটনায় যুক্ত ১২ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১০ জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে।