ভিড়ই কি ধ্বংসের কারণ? মানুষের সমাজ সম্পর্কে সবচেয়ে বিপজ্জনক কী বার্তা দিয়েছিল ‘ইউনিভার্স ২৫’?

আমাদের বিশ্ব যেমন বিশাল, মানুষের সমাজও তেমনি জটিল। মানুষের আচরণ, সামাজিক কাঠামো এবং জনঘনত্বের প্রভাব বুঝতে মার্কিন ইথোলজিস্ট জন বি ক্যালহুন (John B. Calhoun) 1968 থেকে 1972 সালের মধ্যে ইঁদুরদের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেছিলেন, যা ‘ইউনিভার্স ২৫’ (Universe 25) নামে পরিচিত।
ক্যালহুন ইঁদুরদের জন্য 2.7 বর্গমিটারের একটি ‘আদর্শ পরিবেশ’ বা ইউটোপিয়া তৈরি করেছিলেন, যেখানে তাদের পর্যাপ্ত খাবার, জল, বাসা তৈরির উপাদান এবং শিকারী থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। এই পরিবেশে ইঁদুরদের জীবনধারণের সবরকম সুবিধা ছিল, যাতে তারা অবাধে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
ইউনিভার্স ২৫-এর পতন:
পরীক্ষাটি চারটি ধাপে বিভক্ত ছিল, কিন্তু জনঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে সামাজিক পতন শুরু হয়:
জনসংখ্যা বৃদ্ধি: প্রথম দিকে, ইঁদুরের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, প্রতি 55 দিনে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। জনসংখ্যা 620-এ পৌঁছানোর পর বৃদ্ধির গতি কমতে শুরু করে।
সামাজিক ভাঙন (‘Behavioral Sink’): জনঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে ইঁদুরদের স্বাভাবিক আচরণ পুরোপুরি পাল্টে যেতে শুরু করে। ক্যালহুন এই অবস্থাকে ‘বিহেভিওরাল সিঙ্ক’ (আচরণের পাঁক) নাম দেন, যার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:
অতিরিক্ত আগ্রাসন: পুরুষ ইঁদুররা অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সামান্য বিবাদও মারাত্মক সংঘাতে পরিণত হয়।
আসামাজিক আচরণ: কিছু ইঁদুর, যাদের ‘বিউটিফুল ওয়ানস’ বলা হত, তারা প্রজনন বা সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল খাওয়া, ঘুমানো এবং নিজেদের সাজসজ্জায় মনোযোগ দিত।
প্রজনন ক্ষমতার বিনাশ: মা ইঁদুররা তাদের বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া ছেড়ে দেয়, ফলে শিশুদের মৃত্যুহার 90 শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। প্রজনন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।
বিশৃঙ্খলা: পুরুষরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা ভুলে যায়, এবং কিছু ইঁদুর সমকামী আচরণ, নরমাংস ভক্ষণ এবং দলবদ্ধ আক্রমণ শুরু করে।
বিলুপ্তি: সবরকম সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ায় জন্মহার কমে যায় এবং বিদ্যমান ইঁদুরগুলো প্রজনন বন্ধ করে দেয়। 1,780 দিন পর কলোনিটি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এই পরীক্ষাটি জনঘনত্ব এবং সীমিত স্থানের প্রেক্ষাপটে মানুষের সামাজিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। যদিও এটি ইঁদুরদের উপর করা হয়েছিল, ক্যালহুন এটিকে মানব সমাজের ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছিলেন।