টেলিকম বিপ্লব, মুকেশ আম্বানির জিও কীভাবে ভারতের ইন্টারনেট মানচিত্র বদলে দিল,

এক সময় ল্যান্ডলাইনের সংযোগ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো, সেই ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা ইন্টারনেট এবং মোবাইল পরিষেবাগুলোর অন্যতম সরবরাহকারী। গত ১৫-১৬ বছরে দেশের টেলিকম খাতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হলো মুকেশ আম্বানির টেলিকম সংস্থা জিও-র। এটি কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোরও পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইলের পথে ভারতের টেলিকম যাত্রা:

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে টেলিকম খাত ছিল সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। এই কারণে ল্যান্ডলাইন সংযোগ পাওয়া ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ১৯৯৪ সালের ন্যাশনাল টেলিকম পলিসির পর এই অবস্থার পরিবর্তন আসে, এবং প্রাইভেট মোবাইল অপারেটরদের জন্য দরজা খুলে যায়। ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই প্রথম মোবাইল কল হয় দিল্লি থেকে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে। তখন প্রতি মিনিট কলের খরচ ছিল ১৬ টাকা, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। যেমন, ১৯৯৫ সালে ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল প্রায় ৪,৬০০ টাকা, যা এখন ১ লক্ষ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

১৯৯৯ সালের নতুন টেলিকম পলিসির পর থেকে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে, কল চার্জ কমে যায়, এবং মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে বিলাসবহুল পণ্য থেকে প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়। ২০০০ সালের পর থেকে স্মার্টফোন, ইমেল, ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতেও শুরু হয়।

জিও-র ‘ধাক্কা’ এবং ইন্টারনেট বিপ্লব:

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুকেশ আম্বানির জিও ফোরজি পরিষেবা চালু করে ভারতীয় টেলিকম বাজারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রায় ৮ মাস ধরে বিনামূল্যে ইন্টারনেট এবং কল পরিষেবা দিয়ে জিও দ্রুত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায়। এর আগে ভোডাফোন, এয়ারটেল, আইডিয়া-র মতো সংস্থাগুলোর ৩ জিবি মাসিক ডেটা প্যাকের দাম ছিল প্রায় ৬৫০ টাকা। কিন্তু জিও-র কম খরচের ডেটা প্ল্যান বাজারে আসার পর অন্য সংস্থাগুলোও তাদের ডেটার দাম প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে বাধ্য হয়।

জিও-র এই ‘ইন্টারনেট বিপ্লব’ শুধু টেলিকম শিল্পকেই নয়, ই-কমার্স, ফিনটেক, ওটিটি এবং অনলাইন শিক্ষার মতো খাতগুলোকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেট খরচ কমে যাওয়ায় দেশের মানুষ বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছেন। জিও-র আগমনের ফলে ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি এক নতুন গতি পেয়েছে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে।