কোন নামী দামি ব্রিড নয়, দেশি ‘পারিয়া’রাই হতে পারে আপনার আসল বন্ধু!

অনেকেই বিদেশি প্রজাতির কুকুর যেমন ল্যাব্রাডর, জার্মান শেফার্ড বা গোল্ডেন রিট্রিভারের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন, কিন্তু রাস্তার দেশি কুকুর দেখলে ফিরিয়ে দেন। অথচ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা শুধু দামি ব্রিডকেই প্রভুভক্ত ও নির্ভরশীল মনে করেন, তারা ভুল ভাবছেন। আপনার পাড়ার রাস্তার ‘কালু’, ‘লালু’ বা ‘ভুলু’রাই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কৃতজ্ঞ সঙ্গী। এদেরকেই আদর করে বলা হয় ‘ইন্ডিয়ান পারিয়া’ বা দেশি জাতের রাস্তার কুকুর।

মহাভারত থেকে আজও একই বিশ্বাস

মহাভারতের যুগে যুধিষ্ঠিরের মহাপ্রস্থানের পথে যে কুকুরটি অবিচল সঙ্গী হয়েছিল, সেই গল্প আজও মানুষের কাছে কুকুরের প্রতি বিশ্বস্ততার এক প্রতীক। গবেষকরাও কুকুরের এই বিশ্বস্ত ও অনুগামী স্বভাবের পেছনে বিভিন্ন কারণ খুঁজে পেয়েছেন। জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের সঙ্গে কুকুরের এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এক গভীর বন্ধনে আবদ্ধ।

কেন দেশি ‘পারিয়া’রা আলাদা?

দামি বিদেশি ব্রিডের কুকুরেরা তাদের প্রভুর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়। তাদের খাওয়া-দাওয়া, যত্ন, অসুস্থতা – সবকিছুর জন্য প্রভুর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একবার বৃষ্টিতে ভিজলেই ঠান্ডা লেগে যায়, চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হয়। কিন্তু দেশি জাতের কুকুরেরা জন্ম থেকেই লড়াকু। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, অনাহার – এই প্রতিকূলতা তাদের সংগ্রামী করে তোলে। ছোটবেলা থেকেই নিজেদের খাবার নিজেরাই জোগাড় করতে শিখেছে, হয়তো অন্য কুকুরদের সাথে লড়াই করেই। এই কঠোর জীবনই তাদের আরও দৃঢ়, আরও সজাগ করে তোলে।

অন্যদিকে, একটি দেশি কুকুরকে ভালোবাসা দিতে আপনার বিশেষ কিছু করার প্রয়োজন নেই। দিনে একবার বিস্কুট বা রুটি, গরমের দিনে এক বাটি জল, আর একটু আদর – ব্যাস! এইটুকুই তাদের আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ রাখতে যথেষ্ট। আপনার একটু ভালোবাসা পেলেই তারা আহ্লাদে আটখানা হয়ে আপনার পায়ে পায়ে ঘুরবে, আপনাকে একবেলা না দেখলে তাদের মুখ ভার হয়ে যাবে। পরের বার দেখা হলেই তাদের চোখ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে, আদর পাওয়ার জন্য আপনার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়বে। এদের জন্য খরচ কম, কিন্তু প্রাপ্তি অনেক বেশি। আপনি সামান্য মায়া দেখালেই ওরা যেন সারাজীবনের জন্য আপনাকে ভালোবাসবে, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

আপনার পাড়ার পাহারাদার বন্ধু

দেশি কুকুরেরা কেবল বিশ্বস্ত বন্ধুই নয়, তারা আপনার পাড়ার একনিষ্ঠ পাহারাদারও বটে। প্রতিদিন পাড়ায় নজরদারি চালানো যেন তাদের দায়িত্বের অংশ। অপরিচিত কাউকে দেখলেই তারা শব্দ করে সতর্ক করে দেয় এবং সন্দেহভাজন মনে না হওয়া পর্যন্ত পিছু ছাড়ে না। শুধু দিনের বেলাই নয়, রাত জেগেও তারা পাড়া পাহারা দেয়। তাদের সজাগ নজর আর চিৎকারে চোর-ডাকাত পাড়ায় ঘেঁষার সাহস পায় না। অথচ, সেই সময় আপনার বিদেশি দামি ব্রিডের পোষ্য হয়তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আপনার সাথে আরামে ঘুমাচ্ছে।

এই দেশি কুকুরেরা পাড়ার বাচ্চাদের সাথেও খুব সহজে মিশে যায়। ফুটবল খেলা হোক বা লুকোচুরি, বাচ্চাদের খেলার সঙ্গী হতে তাদের জুড়ি নেই। কারণ, সেই নিষ্পাপ শিশুদের নির্ভেজাল ভালোবাসা তারা বোঝে এবং বিনিময়ে তাদের প্রতিও ভালোবাসা উজাড় করে দেয়।

সুতরাং, আপনার সারমেয়প্রেমী মন যদি কেবল বিদেশি ব্রিডেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে একবার আপনার পাড়ার এই দেশি ‘পারিয়া’দের দিকে তাকিয়ে দেখুন। হয়তো আপনার জীবনের সেরা বন্ধু এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত পাহারাদারটি আপনার দোরগোড়াতেই অপেক্ষা করছে।