৩৭ বছর পর ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত ৫৩ বছর বয়সি ব্যাক্তিকে হোমে পাঠানোর নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের!

রাজস্থানের আজমেরে ১৯৮৮ সালের ১৭ই নভেম্বরের এক চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনায় দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে চলা বিচার প্রক্রিয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট এক নজিরবিহীন রায় দিয়েছে। ১১ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৬ বছর বয়সি কিশোর, বর্তমানে যার বয়স ৫৩ বছর, তাকে ‘জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের’ কাছে পাঠিয়ে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য বিশেষ হোমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এই রায় ভারতের বিচারব্যবস্থায় কিশোর অপরাধ আইন এবং দীর্ঘসূত্রিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

মামলার প্রেক্ষাপট ও নিম্ন আদালতের রায়:

ঘটনার দিন, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ১৭ই নভেম্বর, রাজস্থানের আজমেরে এক ১১ বছর বয়সি নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এক ১৬ বছর বয়সি কিশোরের বিরুদ্ধে। এই মামলা দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন আদালতে চলছিল। ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্তকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪২ (অবৈধভাবে আটকে রাখা) এবং ৩৭৬ (ধর্ষণ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। পরবর্তীতে রাজস্থান হাইকোর্টও সেই রায় বহাল রাখে।

সুপ্রিম কোর্টে মামলা এবং যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ:

ট্রায়াল কোর্ট এবং রাজস্থান হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান। সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান যে, অপরাধ সংঘটনের সময় তার মক্কেল একজন নাবালক ছিল, যার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।

প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহর বেঞ্চ এই যুক্তির ভিত্তিতে শুনানি গ্রহণ করে। সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানায়, মামলার অভিযোগ শুধুমাত্র নির্যাতিতার সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং অন্যান্য সাক্ষীদের বিবৃতি এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ দ্বারাও তা দৃঢ়ভাবে সমর্থিত। আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, দোষ সাব্যস্ত করার প্রমাণগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নিম্ন আদালতগুলির দেওয়া রায়গুলোতেও কোনো ভুল ছিল না।

কিশোর অপরাধ আইনের প্রয়োগ এবং রাজ্যের যুক্তি:

তবে, আদালত স্বীকার করেছে যে, অপরাধ সংঘটনের সময় অভিযুক্ত কিশোর ছিল এবং সে হিসেবে তাকে ‘জুভেনাইল জাস্টিস আইন’-এর আওতায় আনা উচিত। রাজ্য সরকারের আইনজীবী অবশ্য যুক্তি দেন যে, এই ৫৩ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরে কিশোরত্বের দাবি তোলার কোনো মানে হয় না। কিন্তু আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানায় যে, ভারতের বিচারব্যবস্থায় কিশোরত্বের দাবি যেকোনো পর্যায়ে, এমনকি চূড়ান্ত রায়ের পরেও তোলা যেতে পারে এবং আদালত সেটিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য।

চূড়ান্ত রায় ও এর প্রভাব:

ফলে, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, ট্রায়াল কোর্ট ও হাইকোর্ট যে সাজা দিয়েছে, তা আর বহাল থাকতে পারে না। সেই সাজা বাতিল করে বিষয়টি জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছে। বোর্ড এখন চাইলে ৫৩ বছর বয়সি ওই ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য বিশেষ সংশোধনাগারে (হোমে) পাঠাতে পারে।

এই ঘটনা একদিকে যেমন ভারতের দীর্ঘ বিচার-প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং দেরির চিত্র তুলে ধরে, তেমনি আইনগত প্রক্রিয়ায় কিশোরের অধিকার সংরক্ষণের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। এই রায় ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলাগুলির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।