হাওড়া ব্রিজের আসলে কী হাল? আয়ুষ্কাল বাড়াতে প্রযুক্তির ছোঁয়া, সেন্সর বসানোর সিদ্ধান্ত

কলকাতার আইকনিক হাওড়া সেতুর ‘স্বাস্থ্য’ সুরক্ষিত রাখতে এবার এক নতুন পদক্ষেপ নিতে চলেছে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘস্থায়ী এই ক্যান্টিলিভার সাসপেনশন সেতুটির লোহার কাঠামো এবং স্তম্ভগুলির বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যার রিপোর্ট ইতিমধ্যেই জমা দিয়েছে RITES। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সেতুটির ডেকের কিছু অংশ এবং জয়েন্টগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হতে চলেছে, যা প্রায় দেড় বছর ধরে চলবে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এই স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেতুটির প্রতিটি লোহার কাঠামোর কোণ এবং অন্যান্য অংশগুলি ঠিকঠাক অবস্থায় আছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা। বন্দরের ডেপুটি চেয়ারম্যান সম্রাট রাহি নিশ্চিত করেছেন যে, এই রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু অংশে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ জরুরি।
প্রতিদিনের নজরদারি: সেন্সর প্রযুক্তির প্রয়োগ
সেতুটির স্বাস্থ্যের ওপর প্রতিদিন নজর রাখতে এবার একটি আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করা হচ্ছে। হাওড়া ব্রিজে একাধিক সেন্সর বসানো হবে, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত আসা ডেটা পরীক্ষা করে সেতুর প্রতিটি অংশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এটি সেতুটির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্মাণের ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
১৯২৬ সালে আর এন মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে একটি কমিশন হুগলি নদীর উপর এই বিশেষ ধরনের ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেছিল। সেই মোতাবেক ১৯৩৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ৪০৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ২১.৬ মিটার প্রস্থের এই সেতুটি প্রতিদিন প্রায় ১,৫০,০০০ পথচারী এবং ১ লক্ষ গাড়ি বহন করে। বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫৫০টি গাড়ি এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করে, যা এর ওপর বিশাল চাপ তৈরি করে।
বিশেষ প্রকৌশল এবং তার জটিলতা
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বজিৎ সোমের মতে, হাওড়া ব্রিজ একটি ক্যান্টিলিভার সাসপেনশন সেতু। এর উপরের অংশটি ব্রিজের মূল কাঠামো, যা হ্যাঙ্গারগুলির মাধ্যমে নিচের ডেককে ধরে রেখেছে। এই হ্যাঙ্গারগুলির মধ্যে থাকা পিনগুলিই পুরো ডেকটিকে ধারণ করে রাখে। বিশ্বজিৎ সোম উল্লেখ করেছেন যে, “হ্যাঙ্গারের মধ্যে পিন আছে। সেই পিন একটা গোটা ডেক ধরে রেখেছে। ফলে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অবশ্যই সেই পিন দেখা হবে। কারণ শ্যাফটের মধ্যে থাকা পিন ঘষা খেলে কী হয় প্রতিদিন সেটা ইঞ্জিনিয়াররা জানেন।”
তিনি আরও জানান, হাওড়া ব্রিজ অত্যন্ত উচ্চমানের স্টিল দিয়ে তৈরি, এবং যত উচ্চমানের স্টিল হয়, তত তার ‘ক্লান্তি’ (fatigue) আসে। যা ওপর থেকে সবসময় বোঝা যায় না এবং হঠাৎ করেই সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেতুর মধ্যে থাকা ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ (সম্প্রসারণ-প্রসারণ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা পিস্টন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেকোনো বড় অঘটন সাধারণত এই জয়েন্ট থেকেই হতে পারে। তাই ইঞ্জিনিয়ারদের এই দিকগুলিতে বিশেষ নজর দিতে হবে।
২০০৪ সালে শেষবার বিটুমিনাস স্ক্র্যাপিংয়ের কাজ হয়েছিল। বর্তমানের এই বিশদ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আধুনিক সেন্সর সংযোজন, শতাব্দী প্রাচীন এই সেতুর দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।