বাবার উৎসাহে টেনিসের দুনিয়ায়, সেই বাবা কেন হত্যা করলেন নিজের মেয়ে রাধিকাকে ?

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রামে বাবার গুলিতে জাতীয় পর্যায়ের টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদবের (২৫) মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। যে বাবা নিজে হাতে মেয়ের টেনিসের স্বপ্ন গড়ে দিয়েছিলেন, তিনিই কেন তার জীবন কেড়ে নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে।

রাধিকার বর্ণময় জীবন ও বাবার সমর্থন
২০০০ সালের ২৩ মার্চ গুরুগ্রামে জন্ম নেওয়া রাধিকা যাদব একটি নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন এবং ২০১৮ সালে বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে দ্বাদশ পাশ করেন। ছোটবেলা থেকেই টেনিসের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল, আর এই উৎসাহ জুগিয়েছিলেন তার বাবা দীপক যাদব। মেয়ের খেলা, প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতা— সব দিক থেকে দীপক সমর্থন জুগিয়েছিলেন। এমনকি মেয়ের টেনিস প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলতেও সহযোগিতা করেছিলেন।

রাধিকা ছিলেন হরিয়ানার সেরা পাঁচ টেনিস খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশন (ITF)-এর মহিলাদের ডাবলসে তার র‍্যাঙ্ক ছিল ১১৩। ৫৭টি প্রতিযোগিতায় তিনি ১৮টি সোনার পদক জিতেছিলেন।

তার পরিচিত এবং আত্মীয়রা জানিয়েছেন, রাধিকা ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী। কাঁধের চোটের কারণে তিনি খেলা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি একটি টেনিস প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলেছিলেন, যেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি বেশ সফলভাবে চলছিল। খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি সমানভাবে বাড়ির কাজও সামলাতেন। এমন সফল এবং পরিবারের ভরসার পাত্রী মেয়েটি হঠাৎ করে তার বাবার চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন কেন, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

খুনের নেপথ্যের কারণ: একাধিক তত্ত্বের জালে পুলিশ
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা নাগাদ রান্নাঘরে থাকা রাধিকাকে লক্ষ্য করে বাবা দীপক যাদব পাঁচ রাউন্ড গুলি চালান। তিনটি গুলি তার পিঠ ও বুক ফুঁড়ে দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। রাধিকা খুনের পর এর নেপথ্যে অনেকগুলো প্রসঙ্গ সামনে আসছে:

১. ইনস্টাগ্রাম রিলস ভিডিও:
প্রাথমিকভাবে খুনের নেপথ্যে যে তত্ত্বটি উঠে এসেছে, সেটি হলো রাধিকার ইনস্টাগ্রামে রিলস বানানো। শোনা গিয়েছিল, এই বিষয়টি নিয়ে তার বাবা দীপক খুব একটা খুশি ছিলেন না এবং বারবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। রাধিকা সেই আপত্তি না শোনাতেই দীপক তাকে গুলি করেন বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে, পুলিশের একটি সূত্রের খবর, তদন্ত এগোতেই দেখা গিয়েছে, ইনস্টাগ্রাম রিল বানানো খুনের নেপথ্য কারণ নয়।

২. টেনিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র:
পুলিশি জেরায় দীপক নিজে একটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, রাধিকার টেনিস প্রশিক্ষণকেন্দ্র নিয়ে তিনি খুব একটা খুশি ছিলেন না এবং চাইতেন যে রাধিকা এটি বন্ধ করে দিক। কিন্তু রাধিকা সেই পথে হাঁটেননি এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রও বেশ সফলভাবে চলছিল। তদন্তকারীরা অবশ্য এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

৩. প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের কটাক্ষ:
দীপকের দাবি অনুযায়ী, রাধিকার প্রশিক্ষণকেন্দ্র ভালো চলায় পড়শি এবং আত্মীয়দের কটাক্ষের মুখে পড়তে হচ্ছিল তাকে। তারা কটাক্ষ করে দীপককে বলতেন, ‘ভালোই তো, বসে বসে মেয়ের উপার্জনের টাকায় খাচ্ছিস’। এই কটাক্ষ তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। রাধিকা প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ করতে না চাওয়ায় তিনি গত ১৫ দিন ধরে মানসিকভাবে অত্যন্ত দোলাচলে ছিলেন বলে দাবি করেছেন। মেয়ের জন্য বাইরের লোকের কাছে অপমান সহ্য করতে হচ্ছে, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি বলেও দাবি তার।

এদিকে, রাধিকার মা মঞ্জু যাদব মেয়ের খুনের বিষয়ে পুলিশের কাছে একটিও কথা বলেননি বলে জানা গেছে। তিনি কেবল দাবি করেছেন যে, ঘটনার সময় তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন এবং বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না।

তদন্তের জট ও ‘সম্মানরক্ষার্থে খুন’-এর সম্ভাবনা
প্রাথমিকভাবে এই তত্ত্বগুলি উঠে এলেও পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রশ্নও উঠে এসেছে। যে ব্যক্তি নিজের মেয়ের সাফল্যে গর্ববোধ করতেন এবং শৈশব থেকেই তাকে নানাভাবে সমর্থন করতেন, কী এমন ঘটল যে রাধিকার বিরুদ্ধে তার এমন আক্রোশ জন্মাল? ইনস্টাগ্রাম রিল বানানোর বিষয়টি খুনের কারণ বলে মনে করছেন না তদন্তকারীদের একাংশ। আবার প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ করা নিয়ে বাবা-মেয়ের ঝামেলাকেও এই চরম পদক্ষেপের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে না। যদি প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ করার বিষয়টিই এর কারণ হতো, তাহলে শুরু থেকেই কেন এর বিরোধিতা করেননি দীপক? দীর্ঘ দিন চলার পর কেন তা বন্ধ করার প্রসঙ্গ উঠল?

তদন্তকারীদের একটি সূত্র বলছে, এটি ‘সম্মানরক্ষার্থে’ খুন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল রহস্য উদঘাটনে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।