বিশেষ: মিলনের চরম মুহূর্তে ‘লভ বাইট’-এ হতে পারে স্ট্রোকও! জেনেনিন কি বলছে বিশেষজ্ঞরা?

‘লাভ বাইট’ বা আদরের কামড় হয়তো ভালোবাসার এক ছোট্ট চিহ্ন, যা দু’জন মানুষকে সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আবেগ আর প্রেম কোনো বাধা মানেনি। ভালোবাসায় শারীরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক, এবং সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে প্রেমিকের শরীরে প্রেমিকার আদরের কামড়ও সাধারণ বিষয়। তবে, এই আপাত নিরীহ ‘লাভ বাইট’ আপনার শরীরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি স্ট্রোকের মতো গুরুতর রোগের কারণও হতে পারে, তা কি আপনি জানেন?
কী এই ‘লাভ বাইট’ এবং এর চিকিৎসা পরিভাষা?
‘লাভ বাইট’ হলো ত্বকে তৈরি হওয়া গাঢ় নীল বা বেগুনি রঙের একটি কালশিটে, যা ২০-৩০ সেকেন্ডের চাপ বা কামড়ের ফলে সৃষ্টি হয়। এই আদরের কামড়ের ফলে ত্বকের নিচে থাকা একটি ছোট রক্তনালী ফেটে যায় এবং ওই অংশে রক্ত জমাট বাঁধে, যার ফলে লাল, গাঢ় নীল বা বেগুনি রঙের দাগ তৈরি হয়। চিকিৎসা পরিভাষায় এই ‘লাভ বাইট’-কে ‘এক্চিমোসিস’, ‘এরিথেমা’, ‘হেমাটোমা’, ‘পুরপুরা’, ‘পেটিচিয়া’ নামেও অভিহিত করা হয়।
প্রথম দিকে এটি ছোট চিহ্নের মতো দেখালেও, রক্ত জমাট বাঁধার কারণে প্রথমে লাল, তারপর গাঢ় নীল এবং ধীরে ধীরে হালকা হলুদ রঙ ধারণ করে। সাধারণত, এই দাগ সম্পূর্ণ উধাও হতে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে।
‘লাভ বাইট’-এর ফলে যে ৩ ধরনের গুরুতর সমস্যা হতে পারে
বেঙ্গালুরুর স্পর্শ হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নীতিন কুমার এন bangla.aajtak.in-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘লাভ বাইট’-এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “যুগলের মধ্যে ফোরপ্লে চলাকালীন অনেক সময়ে গলায় বা ঘাড়ে চুম্বনের কারণে চাপ পড়ে নীল-বেগুলি চিহ্ন তৈরি হয়। একেই চলতি কথায় আমরা লাভ বাইট বলে থাকি। সাধারণ বিচারে এটিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না ঠিকই, তবে গত কয়েক বছরে একাধিক সমস্যা সামনে এসেছে।”
মূলত তিন প্রকারের সমস্যা তৈরি হতে পারে:
১. করোটিড সাইনাস: গলায় ‘করোটিড সাইনাস’ নামক নার্ভ সেল থাকে, যা লাভ বাইটের ফলে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এই নার্ভ সেল হার্টের সঙ্গে যুক্ত, ফলে এটি সক্রিয় হলে হার্টবিট কমে যেতে পারে এবং ব্লাড প্রেশারও হ্রাস পেতে পারে। এর কারণে মাথা ঘোরার সমস্যা হতে পারে, এমনকি আচমকা মাথা ঘুরে পড়েও যেতে পারেন।
২. স্ট্রোকের ঝুঁকি: ডা. নীতিন কুমার আরও বলেন, “আগে থেকে গলায় বা ঘাড়ে কোনো রক্ত জমাট বাঁধা অংশ থাকলে তার উপর লাভ বাইট হিতে বিপরীত হতে পারে। রক্ত মাথায় উঠে যেতে পারে, যার ফলেই স্ট্রোক হতে পারে মানুষের।” WebMed সংস্থার দাবি অনুযায়ী, লাভ বাইটের ফলে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ১০০টির মধ্যে ১টি ক্ষেত্রে ঘটে। গলার দুই দিক দিয়েই একটি বিশেষ ধমনী রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘করোটিড’। মস্তিষ্ক, মুখ এবং গলায় রক্ত সঞ্চালন করে এই করোটিড। লাভ বাইটের ফলে এই করোটিডে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে অথবা আগে থেকে সেখানে জমাট বাঁধা রক্তের অংশে ধাক্কা লাগতে পারে, যার জেরেই স্ট্রোকের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
৩. রক্তনালী ফেটে যাওয়া: পাশাপাশি, অনেক সময়ে গলায় বা ঘাড়ে চুম্বনের জেরে অতিরিক্ত চাপ পড়লে সেখানকার রক্তনালী ফেটে যেতে পারে এবং চামড়া ভেদ করে রক্ত বেরোতে পারে। ফলে, যাদের চামড়া সংবেদনশীল, তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে সচেতন হওয়া আবশ্যক।
বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত ও অন্যান্য সম্ভাব্য লক্ষণ
২০১১ সালে নিউ জিল্যান্ডের এক মহিলার লাভ বাইটের জেরে স্ট্রোক হয়। একইভাবে, ডেনমার্কের এক ৩৫ বছর বয়সী মহিলা লাভ বাইটের ১২ ঘণ্টার মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং তার শরীরের ডান দিক অবশ হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, এই দুই মহিলার স্নায়ুঘটিত সমস্যা আগে থেকেই ছিল, সে কারণেই লাভ বাইটে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
এছাড়াও, লাভ বাইটের ফলে তৈরি নীল-বেগুনি চিহ্ন যক্ষ্মা (টিবি), জীবাণু সংক্রমণ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, থ্রম্বোসাইটোপেনিয়ার মতো রোগেরও লক্ষণ হতে পারে। তাই, এমন কোনো চিহ্ন দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভালোবাসার প্রকাশে সতর্কতা অবলম্বন করা কতটা জরুরি, এই তথ্যগুলো তা-ই প্রমাণ করে।