যোগেশচন্দ্র ল কলেজের ‘পাঁচ বছর নিষেধাজ্ঞা’, বিতর্কিত অতীত থেকে কি নতুন শিক্ষা?

সরস্বতী পুজোর বিতর্ক থেকে শুরু করে কসবা ল কলেজের সাম্প্রতিক গণধর্ষণের ঘটনা – রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘বহিরাগত’দের দাপট এক গভীর চিন্তার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী যোগেশচন্দ্র চৌধুরী আইন কলেজ, যা একদা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও শিক্ষাঙ্গন ছিল। কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য জারি হয়েছে এক অভিনব নিষেধাজ্ঞা: পাশ করার পাঁচ বছরের মধ্যে তারা কলেজে প্রবেশ করতে পারবেন না, যদি না তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই পদক্ষেপ কি কেবল যোগেশচন্দ্রের সুনাম রক্ষার চেষ্টা, নাকি রাজ্যের অন্যান্য কলেজেও এর প্রভাব পড়বে?

যোগেশচন্দ্র ল কলেজের তৃণমূল ছাত্র ইউনিয়ন এই নির্দেশিকা জারি করেছে এবং তাদের দাবি, কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে বর্তমান শিক্ষার্থীরাও একে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। কেন এই নির্দিষ্ট নিয়ম শুধু যোগেশচন্দ্রেই, যেখানে রাজ্যের অন্যান্য কলেজেও বহিরাগতদের উপদ্রব নিত্যদিনের ঘটনা? কলেজের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা কি এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি কারণ, যাতে কলেজের ভাবমূর্তি কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ না হয়?

একজন আইনের পড়ুয়া এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেছেন, “যোগেশচন্দ্র চৌধুরী আইন কলেজের পড়ুয়ারা একটি পলিশি এনেছে। পাশ করার পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ কলেজে ঢুকতে পারবে না। যদি না কেউ সংশ্লিষ্ট ওই ছাত্রকে আমন্ত্রণ করে ডেকে আনে কলেজে। বাকি কলেজের কথা বলতে পারব না। তবে যোগেশের একটা ঐতিহ্য আছে। যেটা আমরা মেনে চলি।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, কলেজের নিজস্ব ঐতিহ্য এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, যোগেশচন্দ্র ল কলেজে সরস্বতী পুজোর স্থান নির্ধারণ নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে ‘বহিরাগত’দের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ ওঠে। যদিও তখন কোনো কঠোর বিধি-নিষেধ জারি হয়নি। সাম্প্রতিককালে কসবার একটি আইন কলেজে ইউনিয়ন রুমের ভিতরে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনায় মূল অভিযুক্তরাও ‘বহিরাগত’ ছিল বলে অভিযোগ। শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, কসবার ঘটনার ভয়াবহতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে যোগেশচন্দ্র আগেভাগে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যায়।

তবে এই সিদ্ধান্ত কি সমস্যার মূল সমাধান? নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক উপশম? কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নামে বহিরাগতদের প্রবেশ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কি শুধু একটি নির্দিষ্ট নিয়ম দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলি এখন আরও জোরালোভাবে উঠে আসছে। যোগেশচন্দ্রের এই পদক্ষেপ যদি সফল হয়, তবে কি এটি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি মডেল হয়ে উঠবে, নাকি এটি কেবল একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে।