ভারতের শুভাংশুর মহাকাশ-পাড়ি, জেনেনিন কীভাবে বেছে নেওয়া হয় মহাকাশচারীদের?

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। লখনউয়ের ভূমিপুত্র, ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা আজ ২৫শে জুন মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। ১৪০ কোটির এই বিশাল দেশের প্রতিনিধি হয়ে তিনি প্রবেশ করতে চলেছেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এর কক্ষপথে। ৪১ বছর আগে রাকেশ শর্মা যে ইতিহাস রচনা করেছিলেন, সেই পথ ধরেই শুভাংশু হতে চলেছেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) যাওয়া প্রথম ভারতীয়। তাঁর এই অর্জন নিঃসন্দেহে গোটা দেশের জন্য এক পরম গর্বের মুহূর্ত।

অ্যাক্সিওম মিশন-৪: নেতৃত্ব দেবেন ভারতীয় ক্যাপটেন

নাসা এবং ইসরোর এক যৌথ উদ্যোগ, ‘অ্যাক্সিওম মিশন-৪’-এর অংশ হিসেবে শুভাংশু শুক্লা আগামী ১৪ দিনের জন্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করবেন। এই মিশনের মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছেন শুভাংশু নিজেই, কারণ তিনিই এই ঐতিহাসিক অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর সঙ্গে মহাকাশে যাচ্ছেন আরও তিন সহকর্মী – মার্কিন কমান্ডার পেগি হুইটসন, পোল্যান্ডের মিশন বিশেষজ্ঞ স্লাভোজ উজানস্কি-উইজনিভস্কি এবং হাঙ্গেরির মিশন বিশেষজ্ঞ টিবোর কাপু। এই আন্তর্জাতিক দল মহাকাশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

রাকেশ শর্মার ঐতিহ্যের ধারক

১৯৮৪ সালে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা। রাশিয়ার সয়ুজ মহাকাশযানে তাঁর সেই যাত্রা ভারতকে বিশ্বে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। চার দশক পর সেই ঐতিহ্যের ধারক হয়ে আজ মহাকাশে যাচ্ছেন শুভাংশু শুক্লা। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুভাংশুর উড়ান ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ও ইসরোর নির্বাচন প্রক্রিয়া

২০১৮ সালের স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন যে, খুব শীঘ্রই ভারতের সন্তানরা মহাকাশে যাবে। তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে ২০১৯ সালে শুভাংশু শুক্লাকে ইসরোর মহাকাশচারী নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ করা হয়। দীর্ঘ এবং কঠিন কয়েকটি পর্যায় পেরিয়ে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, ৩৯ বছর বয়সী এই ভারতীয় মহাকাশচারীকে নাসা এবং ইসরোর ‘এক্স-৪’ মিশনের পাইলট হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।

শুভাংশু শুক্লার ব্যক্তিগত জীবন ও উড়ানের অভিজ্ঞতা

১৯৮৫ সালের ১০ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউতে জন্মগ্রহণ করেন শুভাংশু শুক্লা। তাঁর বাবা শম্ভু দয়াল শুক্লা এবং মা আশা শুক্লা, দুজনেই ছেলের এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বে অত্যন্ত আনন্দিত।

শুভাংশু ভারতীয় বিমান বাহিনীর একজন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এবং ISRO-এর গগনযান মিশনের জন্য নির্বাচিত চারজন মহাকাশচারীর মধ্যে অন্যতম। মিগ, জাগুয়ার, হক, মিগ-২১, মিগ-২৯ এবং SU-৩০ MKI-এর মতো বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান ওড়ানোর ২০০০ ঘণ্টারও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

২০০৫ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (NDA) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে, ২০০৬ সালের জুন মাসে তিনি ভারতীয় বিমান বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০১৯ সালের জুন মাসে উইং কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর, একই বছর ইনস্টিটিউট অফ অ্যারোস্পেস মেডিসিন (IAM) এর মাধ্যমে তিনি IAF মহাকাশচারী প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত হন। ২০২১ সালে তিনি রাশিয়ার গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টারে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ভারতে ফিরে বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত মহাকাশচারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাঁর অনুশীলন চালিয়ে যান। ২০২৪ সালে তিনি IAF-এ গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

শুভাংশু তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট এবং তাঁর পরিবারে তিনিই প্রথম যিনি সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান করেছেন। তাঁর স্ত্রী কামনা শুভা শুক্লা একজন দন্তচিকিৎসক। কামনা জানান, তারা দুজনেই তৃতীয় শ্রেণি থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন এবং হাইস্কুলে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়। কামনা, শুভাংশুকে ‘খুব লাজুক, শান্ত, ভদ্র এবং মৃদুভাষী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের সিড নামের একটি ছেলে আছে।

আজ শুভাংশু শুক্লার মহাকাশ যাত্রার মাধ্যমে ভারত মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে। গোটা দেশের শুভকামনা তাঁর সঙ্গী।