ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বাড়িতে ডেকে ‘খুন’, বৌ-কে নিয়ে পালিয়ে গেল স্বামী, প্রমাণ লোপাট করতে….

ছোটবেলার বন্ধুকে বাড়িতে ডেকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করে দেহ বাড়ির ভেতরে পুঁতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে এক দম্পতির বিরুদ্ধে। ময়নাগুড়ির ব্রহ্মপুর এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই ঘটনায় স্বামী পরিমল রায় ও তার স্ত্রী সঙ্গীতা রায় ঘটনার পর থেকেই পলাতক। পুলিশের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কি ত্রিকোণ প্রেম, নাকি অন্য কোনো কারণ, নাকি পুরোটাই ঠান্ডা মাথার পূর্বপরিকল্পিত খুন? এই রহস্য উন্মোচনে ময়নাগুড়িতে আজ, বৃহস্পতিবার, আসছে ফরেনসিক দল।

বুধবার বিকেলে ময়নাগুড়ির ব্রহ্মপুর এলাকার পরিমলের বাড়ির কলপাড়ে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় বছর তিরিশের গৌতম রায়ের মৃতদেহ। পুলিশ সূত্রে খবর, গৌতমের দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, গৌতমকে খুন করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই বাড়ির মালিক পরিমল রায় ও তার স্ত্রী সঙ্গীতা রায় পলাতক। পরিমলের বাড়ির পাশ থেকে একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়েছে।

জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রামীণ) সমীর আহমেদ জানান, “মাটি খুঁড়ে দেহ উদ্ধার হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে ঘটনার তদন্ত হবে। কীভাবে এই ঘটনা ঘটল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

জানা গেছে, নিহত গৌতম রায় এবং অভিযুক্ত পরিমল রায় দুজনেই অসমে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং তারা ছোটবেলার বন্ধু। গত রবিবার দুজনেই অসম থেকে ময়নাগুড়ি আসেন। গৌতমের বাবা দীপেন রায়ের অভিযোগ, তাঁর ছেলের বিয়ের কথা চলছিল। মঙ্গলবার রাতেও পরিবারের সদস্যরা পাত্রী দেখে ফিরেছিলেন। এরপর রাত এগারোটা নাগাদ পরিমল গৌতমকে ফোন করে বাড়িতে ডেকে নেয়। দীপেন রায়ের অভিযোগ, এর আগে পরিমল গৌতমের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল এবং সেই কারণেই তাঁর ছেলেকে খুন করে নিজের বাড়ির মাটিতে পুঁতে রেখে পালিয়ে গেছে।

গৌতমের দাদা হরিশচন্দ্র রায়ও ভাইয়ের দেহ সনাক্ত করার পর বলেন, “ভাইয়ের বিয়ের কথা চলছিল। এর মধ্যে ভাইকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন করেছে পরিমল।”

তবে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কও থাকতে পারে। এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য বাবলু রায় বলেছেন, “এই ধরনের ঘটনা এলাকায় প্রথম। স্বাভাবিকভাবেই এলাকার মানুষদের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে। পরকীয়ার জেরে এই খুন।”

বুধবার সকালে পরিমলের বাড়ির পাশে একটি মোটরসাইকেল পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। এরই মধ্যে পুলিশ জানতে পারে যে, বুধবার সকালে পরিমল তার নিজের বাড়ি থেকে কিছু দূরে মায়ের বাড়িতে গিয়ে মাকে জানায়, “মা, আমি একজনকে খুন করেছি, আমরা পালিয়ে যাচ্ছি।” পরিমল তার স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ পরিমলের মায়ের বাড়িতে পৌঁছায় এবং বৃদ্ধাকে একাধিকবার জেরা করে।

সূত্রের খবর, পরিমলের মা পুলিশকে যাবতীয় ঘটনা জানান। এরপর খুনের ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত হলেও কাকে খুন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রথম দিকে ধন্দ ছিল। এদিকে পরিমলের বাড়ির ভিতর দেহ রয়েছে এই সন্দেহে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে দেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রামীণ) সমীর আহমেদ, ডিএসপি ক্রাইম শান্তিনাথ পাঁজা, ময়নাগুড়ি থানার আইসি সুবল ঘোষ সহ পুলিশের একটি দল।

পরে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং ময়নাগুড়ির বিডিও প্রসেনজিৎ কুন্ডুর উপস্থিতিতে পরিমলের বাড়ির পিছন দিকে কলের পাড়ের মাটি খুঁড়ে গৌতমের দেহ উদ্ধার হয়। অভিযুক্তের বাড়ি থেকে পুলিশ ধাতব সামগ্রীও উদ্ধার করেছে, যা দিয়ে গৌতমকে খুন করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃতদেহটি জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

বুধবার রাতেই গৌতমের বাবা দীপেন রায় ময়নাগুড়ি থানায় পরিমল তার ছেলেকে পরিকল্পনা করে খুন করেছে এই মর্মে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ সুপার উমেশ খান্ডবাহালে প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মৃতের হাত, পা, গলায় নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। মৃতদেহটি জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি থানার আওতাধীন বালাসনের বাসিন্দা গৌতম রায় হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা শুরু করা হয়েছে।

তবে, ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজতে পুলিশ সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। ফরেনসিক দলের আগমন এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।