বাংলাদেশে আর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নন মুজিবুর রহমান, স্বীকৃতি কাড়া হল ৪০০-র বেশি নেতার

এক যুগান্তকারী সরকারি আদেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবার হারালেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’র স্বীকৃতি। তাঁর পরিচয় এখন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ সহ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী চারশোর বেশি রাজনীতিবিদ (এমএনএ/এমপিএ)-এর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিও বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশে এই নেতাদের পরিচয় ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

নতুন সংজ্ঞা, নতুন শ্রেণিবিন্যাস
সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মুজিব সরকারের সদস্যরা এখন থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে গণ্য হবেন। রাষ্ট্রপতির আদেশে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে জারি করা এই অধ্যাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে কারো নাম উল্লেখ না থাকলেও, নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী উল্লেখিত নেতাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বাতিল হয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।

এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারই নয়, আরও চার শ্রেণির স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে:

প্রথম শ্রেণি: যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছেন এবং বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

দ্বিতীয় শ্রেণি: যারা মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর) অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী বা দূতসহ অন্যান্য সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তৃতীয় শ্রেণি: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শিল্পী ও কলাকুশলী এবং দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সব বাংলাদেশি সাংবাদিক।

চতুর্থ শ্রেণি: স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।

উল্লেখ্য, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২’-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রবাসী সরকারের এমএনএ, এমপিএ এবং উল্লিখিত চার শ্রেণির সবাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। নতুন অধ্যাদেশে তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সরকারের ব্যাখ্যা
জামুকা আইন সংশোধনের চূড়ান্ত খসড়াসহ এ-সংক্রান্ত নথি গত ১০ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম স্বাক্ষর করেন। এরপর খসড়াটি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় কয়েক দফা আলোচনা হয়। জানা গেছে, প্রথম দফায় ৬ মে চারশোর বেশি রাজনীতিবিদ, অর্থাৎ ১৯৭০ সালে বিজয়ীদের স্বীকৃতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। এ পর্যায়ে ১৫ মে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার শর্তে খসড়াটি অনুমোদন করা হয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয় ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’র বিষয়টি অনুমোদন দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

সরকার জানিয়েছে, এই শ্রেণিবিন্যাসের ফলে কারও সুযোগ-সুবিধায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। অর্থাৎ, ‘সহযোগী’দের আগের মতোই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান থাকবে।

‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ কারা? অধ্যাদেশে বিস্তারিত
অধ্যাদেশে বিস্তারিত বলা হয়েছে, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হবেন তারাই, যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ভেতরে বা বাইরে প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন— মুক্তি বাহিনীর যোদ্ধা, ইপিআর, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, কিলো ফোর্স, নৌ কমান্ডো, আনসার ও মুজিবনগর সরকারের স্বীকৃত যোদ্ধা। এছাড়া যেসব নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অর্থাৎ ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে পরিচিত, তারাও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’র মর্যাদা পাবেন। যুদ্ধের সময় যারা ফিল্ড হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স বা চিকিৎসা-সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, তারাও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃত থাকবেন।

এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করল, যা ভবিষ্যতে আরও আলোচনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Editor001
  • Editor001