কী কী লাগবে জামাইষষ্ঠী পালন করতে? এই বিশেষ উৎসবের রীতিনীতি সম্পর্কে জেনেনিন

বাঙালির ক্যালেন্ডারে জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই যে উৎসবের আমেজ শুরু হয়, তা হলো জামাই ষষ্ঠী। কেবল কব্জি ডুবিয়ে ভোজ নয়, এই দিনটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আর লৌকিক আচারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় শাশুড়ি মায়েদের নিবেদন, আর বিবাহিত মেয়ে-জামাইকে আদরে আপ্যায়ন— এই নিয়েই গড়ে উঠেছে জামাই ষষ্ঠীর ছবি। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই উৎসবের রীতিনীতিগুলো কি এখনও একইভাবে পালিত হচ্ছে? চলুন, জামাই ষষ্ঠীর কিছু অজানা কথা আর প্রয়োজনীয় উপকরণ সম্পর্কে জেনে নিই।

উপাচারের ডালি: কী কী লাগে জামাই ষষ্ঠীতে?
জামাই ষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্যই হলো জামাইয়ের মঙ্গল কামনা এবং তাকে আপ্যায়ন করা। এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যা শাশুড়ি মায়েদের ব্রত পালনের অঙ্গ:

নতুন বস্ত্র: জামাইকে নতুন বস্ত্র উপহার দেওয়া হয়।
ফল-ফলাদি: জ্যৈষ্ঠ মাসের সেরা উপহার! আম, জাম, কলা, লিচু, কাঁঠাল বা এই সময়ের অন্যান্য গ্রীষ্মকালীন ফল অবশ্যই থালায় শোভা পায়।
পান-সুপারি: বাঙালির যে কোনো শুভ কাজে পান-সুপারি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ধান-১০৮ দূর্বা: মঙ্গল কামনায় ধান ও দূর্বার ব্যবহার চিরাচরিত।
বাঁশের করুল ও করমচা ফল: এই দুটি উপকরণ লোকাচারের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তালের পাখা: জামাইকে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে আশীর্বাদ করা হয়।
উপহার: নতুন বস্ত্র ছাড়াও নানা ধরনের উপহার দিয়ে শাশুড়িরা জামাইদের আপ্যায়ন করেন।
নিয়মকানুন আর আদরের ফোঁটা:
জামাই ষষ্ঠীর দিনের কিছু বিশেষ রীতিনীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে:

হলুদ সুতো: জামাইয়ের হাতে হলুদ মাখানো সুতো বেঁধে দেন শাশুড়ি মা।
তেল-হলুদের ফোঁটা: কপালে তেল-হলুদের ফোঁটা দিয়ে মঙ্গল কামনায় তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করতে করতে বলতে হয় ‘ষাট-ষাট-ষাট’।
ধান-দূর্বার আশীর্বাদ: মাথায় ধান-দূর্বা দিয়ে জামাইকে আশীর্বাদ করেন মেয়ের মা।
পাঁচ ফলের থালা: থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় পাঁচ রকমের গোটা ফল, যা জামাইয়ের সামনে পরিবেশন করা হয়।
তবে, বর্তমান ব্যস্ততার যুগে এই আচারের অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন অনেকেই বাড়িতে জামাই ষষ্ঠী পালন না করে রেস্তোরাঁতেই বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে আদরের জামাইকে আপ্যায়ন করেন।

কেন এত গুরুত্ব?
বাঙালি হিন্দু সমাজে জামাই ষষ্ঠীর গুরুত্ব অপরিসীম। সারা বছর ধরে সকলে অপেক্ষা করে থাকেন এই উৎসবের জন্য। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুর মতো রকমারি ফলের সমাহার থাকে। আর সেই সঙ্গে এই দিনে জামাইদের পাতে পড়ে রকমারি সুস্বাদু পদ, যা বছরের অন্যান্য দিনের থেকে একেবারেই আলাদা। বলাই বাহুল্য, বছরের এই একটি দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ির এই ‘স্পেশাল জামাই আদর’-এর অপেক্ষায় থাকেন সকল জামাইরা।

জামাই ষষ্ঠীর লোককথা:
জামাই ষষ্ঠী নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রচলিত লোককথা ও মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, প্রাচীনকালে এক সংস্কার প্রচলিত ছিল যে, কন্যা যতদিন না পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে, তার বাবা-মা তার গৃহে যাবেন না। তাই জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিকে জামাই ষষ্ঠী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এই প্রথার মাধ্যমে তারা মেয়ের মুখ দেখতে পারতেন।

আরেকটি প্রচলিত কথা হলো, এই দিনে মা ষষ্ঠীর পুজো করে মেয়েরা তাকে খুশি করতেন, যাতে তাদের কোলজুড়ে ফুটফুটে পুত্র সন্তান আসে। বর্তমানে এই সংস্কারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন মা ষষ্ঠীর পুজো ও জামাই আদরের জন্যই এই পার্বণের নামকরণ হয়েছে জামাই ষষ্ঠী। এখন মেয়ে-জামাইকে ডেকে সমাদরে বিশেষ কিছু নিয়ম পালন ও খাওয়া-দাওয়া, আনন্দের মাধ্যমেই এই উৎসব উদযাপন করা হয়।

জামাই ষষ্ঠী ২০২৫-এর দিনক্ষণ:
এই বছর জামাই ষষ্ঠী পড়েছে আগামী ১ জুন, রবিবার, অর্থাৎ ১৭ জ্যৈষ্ঠ। ৩১ মে রাত ১২টা ৩৪ মিনিট ৪ সেকেন্ড থেকে ১ জুন রাত ১২টা ৮ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত থাকবে ষষ্ঠী তিথি।