স্মার্ট মিটার এলে ওঁদের চাকরি যাবেই?-আশঙ্কায় দিন কাটছে অসংখ্য মিটার রিডার কর্মীদের

পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে ‘স্মার্ট মিটার’ চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই আধুনিক ব্যবস্থার ফলে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীদের আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নিতে হবে না, কারণ স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে অফিস থেকেই গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য জানা যাবে। তবে এই পরিবর্তনের ফলে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার মিটার রিডার, যাদের কাজ হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কলকাতায় প্রায় এক হাজার মিটার রিডার কর্মী, যারা একটি ঠিকাদার সংস্থার মাধ্যমে কাজ করতেন, তাদের চাকরি চলে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, স্মার্ট মিটার বসানোর কারণে তাদের কাজের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে, অথচ ঠিকাদার সংস্থা তাদের জন্য কোনো বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করছে না। সংস্থা অবশ্য দাবি করেছে যে, তারা কেবল মিটার রিডিংয়ের কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ ছিল এবং নতুন কাজ দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার অনেক কর্মী কাজ হারানোর আশঙ্কায় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিদ্যুৎ দফতরের এক ঠিকাদার, গোপাল বিশ্বাস, জানিয়েছেন, “আমাদের প্রায় দেড় হাজার কর্মীর চাকরি চলে যেতে পারে। তাই আমরা আন্দোলনের কথা ভাবছি।”

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। তাদের বক্তব্য, ২০০৩ সালের বিদ্যুৎ আইনে গ্রাহকদের স্মার্ট মিটার নিতে বাধ্য করা যায় না। বিরোধীদের মতে, রাজ্য সরকার জোর করে মানুষকে এই মিটার নিতে বাধ্য করছে, যা কৃষিকাজ, দোকান চালানো বা বাজারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই রাজ্য সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।

স্মার্ট মিটার কী এবং গ্রাহকদের সুবিধা

স্মার্ট মিটার একধরনের আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা বিদ্যুৎ খরচ, ভোল্টেজ এবং অন্যান্য তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করে। এই তথ্য সরাসরি বিদ্যুৎ দফতরের অফিসে চলে যায়। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভাগ দূর থেকেই মিটারের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, যেমন – বন্ধ বা চালু করা।

এই মিটারে একটি সিম কার্ড থাকবে যা ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। যদি কোনো গ্রাহক অগ্রিম টাকা রিচার্জ না করেন, তাহলে অফিস থেকেই তার মিটার বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে, টাকার অভাব থাকলেও গ্রাহকরা ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন এবং পরে সেই বকেয়া পরিশোধ করতে পারবেন। বর্তমানের সনাতন মিটারগুলো স্মার্ট না হওয়ায় কর্মীদের হাতে মিটার রিডিং নিতে হয় এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। স্মার্ট মিটার এই সমস্যা দূর করবে।

বিদ্যুৎ দফতরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহর ও আশপাশের এলাকায় স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, অনেকেই এখনও স্মার্ট মিটার কী তা বুঝতে পারছেন না, তাই রাজি হচ্ছেন না। তিনি বলেন, “আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি। এই মিটার বসালে গ্রাহকরা অনেক সুবিধা পাবেন।”

এই নতুন প্রযুক্তির আগমন যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করবে, সেখানেই হাজার হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তা এখন দেখার বিষয়।